পদ্মশ্রী’: কালনা মহকুমা থেকে দুই কৃতীর রাষ্ট্রীয় সম্মানে চমকিত দেশবাসী
দেবাশিস রায়, পূর্ব বর্ধমান: একই জেলা এবং একই মহকুমার মধ্য থেকে এবারে দু’জন কৃতী সন্তান ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপকের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ায় কার্যত দেশবাসীর নজর আটকে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের দিকে।এই অভূতপূর্ব নজিরটি সৃষ্টি হয়েছে রাজ্যের ‘শস্যগোলা’ রূপে পরিচিত পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমায়।জেলার দুই কৃতী সন্তানের একজন তাঁতশিল্পী জ্যোতিষ দেবনাথ এবং অপরজন সাঁওতালি ভাষার সাহিত্যিক রবিলাল টুডু।নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের কঠোর নিষ্ঠা আর নিরলস পরিশ্রমই এই দু’জনকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা প্রাপ্তির ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছে।তাঁদের এই গগনচুম্বী সাফল্যের খতিয়ানই এখন জেলা, রাজ্যের গন্ডি ছাড়িয়ে দেশের কোণায় কোণায় চর্চিত হচ্ছে।জেলার সীমান্তবর্তী মহকুমা শহর কালনার বারুইপাড়া এলাকার বাসিন্দা জ্যোতিষ দেবনাথ একজন প্রতিভাবান তাঁতশিল্পী।তাঁর অসাধারণ ভাবনায় ও সুদক্ষ হাতে তৈরি শাড়ি, ওড়না সহ নানাবিধ বস্ত্র সামগ্রী দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের নজর কেড়ে নেয়।এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে দেশের প্রখ্যাত তাঁতশিল্পীদের তালিকায় নিজেকে মেলে ধরেন।একইসঙ্গে কালনার বিভিন্ন এলাকায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শতাধিক তাঁতশিল্পীর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।একসময় কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি দেশের একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হন।এবারে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান প্রাপকের তালিকায় তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত কালনাবাসী।অন্যদিকে, এই মহকুমারই কালনা ২ ব্লকের নোয়াড়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রবিলাল টুডু সাঁওতালি সাহিত্য চর্চায় অসামান্য অবদান রাখায় এবারে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানের জন্য মনোনীত হয়েছেন।আদিবাসী সমাজের জন্য তিনি সাঁওতালি ভাষায় অসংখ্য নাটক, কবিতা, সাহিত্য রচনার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হন।তাঁর এইসব সাহিত্যকর্ম নানাভাবে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।রবিলাল টুডু তাঁর সৃষ্টিশীল কর্মের জন্য ইতিমধ্যেই সাহিত্য আকাদেমি সহ নানাবিধ সম্মানে ভূষিতও হয়েছেন।কালনার এই দুই কৃতী ভূমিপুত্রের নাম এবারে ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপকের তালিকায় ঠাঁই পাওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই উচ্ছ্বসিত হয়ে তাঁদের বাড়ি গিয়ে সংবর্ধনা জানিয়ে আসেন রাজ্যের প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ।স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্ব বর্ধমান জেলার সীমান্তবর্তী কালনা মহকুমা মূলত কৃষি অধ্যূষিত হলেও বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।বিশেষ করে সমুদ্রগড়, নাদনঘাট, লক্ষ্মীপুর, আটপাড়া, চুপী, কাষ্ঠশালী, মেড়তলা-ফলেয়া, ভান্ডারটিকুরী, পাটুলী, শ্রীরামপুর, জামালপুর, ধাত্রীগ্রাম, নান্দাই প্রভৃতি এলাকায় হস্তচালিত তাঁতশিল্পের রমরমা।এসব এলাকার ‘লড়াকু’ ও সুদক্ষ শিল্পীদের তৈরি শাড়ি সহ নানাবিধ তাঁতবস্ত্রের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যথেষ্ট কদর রয়েছে।এরই পাশাপাশি কালনা মহকুমার বিস্তীর্ণ অংশে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লক্ষাধিক মানুষের বসবাস রয়েছে।এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন সাধারণত শ্রমজীবী এবং অনেকেই পিছিয়ে পড়া শ্রেণীভুক্ত।এই সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই একসময় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।তবে, একাধিক প্রচেষ্টায় সেই পরিস্থিতির অনেকখানিই বদল হয়েছে।কালনা মহকুমার এমনতর মাটির কাছাকাছি থেকে উঠে আসা দুই ভূমিপুত্রের এহেন নজরকাড়া সাফল্যে কার্যত চমকিত দেশবাসী।
admin