পশ্চিম গাজীপুরের চক্রবর্তী পরিবারের জোড়া কালীপুজো !!

পশ্চিম গাজীপুরের চক্রবর্তী পরিবারের জোড়া কালীপুজো !!
অসীম কুমার মিত্র: আজও প্রতি অমাবস্যায় গভীর রাতে মায়ের পায়ের নূপুরের শব্দ শুনতে পান জোড়া কালীতলার বাসিন্দারা হাওড়া জেলার আমতা দু নম্বর ব্লকের অধীন গাজীপুর গ্রাম । আমতা থানার অন্তর্গত এই গ্রামের ইতিহাস বহু প্রাচীন । আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে গাজীপুর বা তার আশপাশের গ্রামগুলির ভৌগলিক চিত্র ছিল অন্যরকম ।বন্যাকবলিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল ওইসব গ্রাম ।গ্রামগুলোর কোলঘেঁষে দামোদর নদ প্রবাহিত হওয়ার ফলে বেশিরভাগ অংশই জলমগ্ন থাকত । আনুমানিক ৫০০ বছর আগে বর্ধমানের মহারাজার সঙ্গে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের প্রথম পুরুষ এবং তৎকালীন বর্ধমান মহারাজার রাজ পুরোহিত সীতানাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাই সাধক ওঙ্কারনাথ  বন্দ্যোপাধ্যায় নৌকা করে বেড়াতে আসেন গাজীপুরে ।সেইসময় গাজীপুরের অবস্থা ছিল অনেকটা শ্মশানপুরীর মতো । অধিকাংশ স্থানই ছিল জলে ডোবা । তারই মধ্যে উঁচু ঢিবির মতো কিছুটা জায়গা ছিল জলের উপরে । সেই জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটান বর্ধমান মহারাজা এবং বন্দ্যোপাধ্যায় ভায়েরা । পরের দিন সকালে মহারাজ যখন বর্ধমানে রওনা দেবার জন্য তৈরি হচ্ছেন ,সেসময় সাধক ওঙ্কার নাথ গাজীপুর থেকে আর ফিরে যেতে চাইছিলেন না । মহারাজা কারণ জানতে চাইলে ওঙ্কারনাথ বলেন _গত রাতে মা আমাকে স্বপ্নাদেশ দেন যে ,মাটির ওই উচুঁ ঢিবির নিচে থেকে (বর্তমানে যে জায়গায় মায়ের মন্দির রয়েছে ) আমাকে তুলে এনে ওই জায়গায় প্রতিষ্ঠা করে পুজো কর । সাধকের মুখে এই কথা শোনার পর মহারাজা সাধকের দাদা  সীতানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বর্ধমানে ফিরে গেলেন । দিন কয়েক কাটার পর সীতানাথও আর বর্ধমানে থাকতে চাইলেন না । একদিন তিনি মহারাজা কে বললেন তিনি ভাই এর কাছে ফিরে যেতে চান । আপনি ব্যবস্থা করুণ । তখন মহারাজা সীতানাথ কে নিয়ে গাজীপুর এলেন এবং গাজীপুরের সেই স্থানেই উঁচু ঢিবি থেকে মাকে (বিশেষ ধরনের এক ধাতুর তৈরি মায়ের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ )উদ্ধার করে মায়ের মন্দির এবং সীতানাথদের বাসস্থান নির্মাণ করে দিলেন ।সেই থেকে শ্যামা মায়ের পুজো শুরু এবং আজ অবধি তা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে । সীতানাথবাবুর চার পুত্র । এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র যিনি ,কেবল তার বংশধরেরাই সাধক ওঙ্কারনাথ-র অবর্তমানে পুজোর সময় মায়ের সামনে পাতা আসনে বসার অধিকারী । সেই পরম্পরা আজও বজায় রয়েছে । বর্ধমান মহারাজা হতে প্রাপ্ত " রাজ চক্রবর্তী "উপাধি সীতানাথবাবুর চার পুত্র হতেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে , বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পরিবর্তে । সাধক ওঙ্কারনাথ একদা চার ভাতুস্পুত্রদের বিধান দিলেন ,বছরে একবার সকলে মিলে একত্রিত হয়ে তাদের নিত্য পূজিত মূর্তির অনুরূপ মাটির প্রতিমা তৈরি করে পঞ্চমুন্ডি বেদীতে বসিয়ে ,’দীপান্বিতা   অমাবস্যা’য় মায়ের পুজো-আরাধনা করতে । সেই থেকে এই পুজো পূর্ব নিয়মরীতি মেনেই চলে আসছে । প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে এই পরিবারের এক কর্তার সাথে পরিবারের বাকি সদস্যদের পুজো বিষয়ে মতান্তর হওয়ায় ওই কর্তা আলাদা ভাবে একই রকম প্রতিমা নির্মাণ করে,  একই নিয়ম মেনে ঐ চৌহদ্দির মধ্যেই পুজো শুরু করেন । সেই থেকে চক্রবর্তী পরিবারের পুজো "জোড়া কালীপুজো "হিসাবে পরিচিতি পায় এবং ওই জায়গাটি ‘জোড়া কালীতলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে । শুরুর দিকে পুজোর দিনে নৈবেদ্য হিসাবে ৬মন ১০সের চাল দেওয়া হতো ।তখন এই ব্যবস্থা করে দিতেন বর্ধমান মহারাজা নিজেই। বর্তমানে নৈবেদ্য দেওয়া হয় ২মন চালের ।
বলি প্রথা আছে এখানে । প্রতি বছর একটি করে পাঁঠা বলি হয় এবং সেটা আবশ্যিক । পুজোর প্রথম দিনে পঞ্চব্যাঞ্জন ও মাছের ভোগ মাকে অর্পণ করা হয় ।পরের দিন অর্থাৎ বিজয়ার দিন সকালে মাকে নিবেদন করা হয় ,পান্তাভাত আর কাসুন্দি দিয়ে শোল মাছ । এটা এই পরিবারের চিরপ্রথা । পরিবারের বর্তমান সদস্য (বড় কর্তার বংশধর )শুকদেব চক্রবর্তী জানালেন, মায়ের নিত্য পুজো তিনিই করেন । তিনি আরও বলেন,  গাজীপুরে সর্বপ্রথম কালী পুজো হয় তাদের পরিবারেই । মা এখানে খুবই জাগ্রত এবং গোটা গ্রাম সেটা মানে । এখানে মায়ের প্রতিষ্ঠা করা পুকুরের নাম কালী পুকুর । ওই পুকুরের জল নিয়ে মায়ের পুজোর যাবতীয় কাজ করা হয় । কালী পুকুরের জল খুবই পবিত্র । এই বিষয়ে অতীতের এক ঘটনার কথা জানালেন শুকদেব বাবু -তার কোনো এক পূর্বপুরুষ ,যিনি পুজোর দিনে মায়ের আসনে বসবেন ,তার আগের রাত্রে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন । ভীষণ জ্বর নিয়ে আসনে বসার অবস্থায় নেই তিনি । সেই সময় পরিবারের পরামর্শে কালী পুকুরের জলে ডুব দিলেন তিনি। আশ্চর্যভাবে, জল থেকে ওঠার পর তার জ্বর উধাও । সম্পূর্ন সুস্থ তিনি ।তারপর যথারীতি তিনি মায়ের আসনে বসলেন এবং পুজো করতে সফল হলেন ।  চক্রবর্তী পরিবারের এইপুজোর প্রতিমা গড়ার মাটি ওঠে দুর্গাপুজোর দশমীর দিনে । প্রতি মাসের অমাবস্যায় পঞ্চমুন্ডি বেদীতে মায়ের আরাধনা হয় ।পরিবারের বর্তমান গৃহকর্তী শুকদেব বাবুর স্ত্রীর কথায়, "মা আমাদের বড়ই আদরিনি ,মাকে নিয়েই আমাদের বেচেঁ থাকা। আজও গভীর রাতে মায়ের পায়ের নূপুরের ধ্বনি আমরা শুনতে পাই " ।