সুন্দরবনের প্রত্যন্ত সাগরদ্বীপে ভাঙন মেরামতি ও পরিকাঠামো উন্নয়ন: মেলা ২০২৭-এর প্রস্তুতিতে ৫ কোটি ১৩ লক্ষ টাকার বড় বরাদ্দ

সুন্দরবনের প্রত্যন্ত সাগরদ্বীপে ভাঙন মেরামতি ও পরিকাঠামো উন্নয়ন: মেলা ২০২৭-এর প্রস্তুতিতে ৫ কোটি ১৩ লক্ষ টাকার বড় বরাদ্দ

সৌরভ নস্কর, গঙ্গাসাগর : ​সুন্দরবনের কোলে অবস্থিত প্রত্যন্ত ও দুর্গমদ্বীপ অঞ্চল গঙ্গাসাগরে আগামী মেলাকে আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে এবং সম্প্রতি ভাঙনকবলিত এলাকার ক্ষত সারাতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এই দ্বীপের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে জয় করে মেলা শুরুর প্রাক্কালে গঙ্গাসাগরের ঘাট, সৈকত, জেটি এবং যাতায়াতের পরিকাঠামো ঢেলে সাজানোর জন্য বড়সড় পদক্ষেপ করেছে সেচ ও জলপথ দফতর।ইতিমধ্যে একাধিক কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। স্নানঘাটের সৌন্দর্যায়ন, সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা বলয় তৈরি, পুণ্যার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ঢালু পথ বা র‍্যাম্প নির্মাণ এবং কচুবেড়িয়া জেটি সংস্কার—সব মিলিয়ে এই দফায় মোট বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রকৃতি প্রায়শই নিজের রূপ বদলায়। গত সেপ্টেম্বর মাসের পূর্ণিমার ভরা কোটালে গঙ্গাসাগরের ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনি মন্দির সংলগ্ন এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছিল।সেই সময় ২ থেকে ৬ নম্বর স্নানঘাটের মধ্যবর্তী প্রায় ৬০ ফুট অংশ হড়পা বানের মতো ধসে সমুদ্রে তলিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, মন্দিরের ঠিক সামনে প্রায় ১৭০ মিটার দীর্ঘ নদীবাঁধও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অংশটি দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে মেরামতের জন্য প্রায় ১ কোটি ২১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সেচ দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনের বিশেষ মাটি ও জোয়ার-ভাটার চরিত্রের কথা মাথায় রেখে চেন্নাই আইআইটি এবং খড়গপুর আইআইটি-র বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। তাদের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনেই ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে, যাতে ভবিষ্যতে নদীর গ্রাস থেকে এই পবিত্র ও জনবহুল চত্বরকে সুরক্ষিত রাখা যায়। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এই জনপদে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সুরক্ষা এবং মেলা চত্বরের সামগ্রিক রূপ বদলে দিতে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে সুনির্দিষ্ট একাধিক খাতে। এর মধ্যে রয়েছে—​ভাঙন মেরামত ও নদীবাঁধ সংস্কার: প্রায় ১ কোটি ২১ লক্ষ টাকা। ​ক্ষতিগ্রস্ত সমুদ্রতীর পুনর্গঠন (দুটি ভিন্ন কাজ): প্রায় ১ কোটি ১৯৯ লক্ষ বা ১ কোটি ৯১ লক্ষ টাকা।​অস্থায়ী শিবির কার্যালয় নির্মাণ ও সৈকত পরিচ্ছন্নতা রক্ষা: প্রায় ৪৩ লক্ষ ৭৮ হাজার টাকা। ​স্নানঘাটের সৌন্দর্যায়ন ও ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ বসানো: প্রায় ৪৭ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা। ​ঘাটে নিরাপত্তা বেড়া দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা জোরদার করার ব্যবস্থা: প্রায় ১৭ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা। ​পুণ্যার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য গঙ্গাসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ঢালু পথ বা র‍্যাম্প নির্মাণ: প্রায় ৭৪ লক্ষ টাকা।​কচুবেড়িয়া জেটি সংস্কার: প্রায় ১৮ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে দেশ তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী সুন্দরবনের এই সাগরদ্বীপে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সুগম করতে প্রশাসন এবার অত্যন্ত কঠোর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, "এ বারের গঙ্গাসাগর মেলা আন্তর্জাতিক মানের করব। ইতিমধ্যেই তার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।" মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশকে সামনে রেখেই সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোমর বেঁধে নেমেছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলি। কাকদ্বীপ মহকুমার সেচ দফতরের এক আধিকারিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "সুন্দরবনের এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলি দ্রুত মেরামতের জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভাঙনের তীব্রতা ও ঝুঁকি কমানোর স্থায়ী বন্দোবস্তের বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছি। ​সাগরের বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডল এই প্রসঙ্গে বলেন, "মেলার আগে গঙ্গাসাগরের পরিকাঠামো উন্নয়নের সমস্ত কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। একই সঙ্গে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলির ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।" অন্যদিকে, শ্রীধাম গঙ্গাসাগর স্বামী কপিলানন্দ বিদ্যাভবনের স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিনয়কৃষ্ণ মন্ডল এই সার্বিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, মেলার আগে পরিকাঠামোর এমন আমূল পরিবর্তন হলে যেমন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীরা উপকৃত হবেন, তেমনই সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারাও এর দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাবেন।সব মিলিয়ে, আগামী গঙ্গাসাগর মেলাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে এখন থেকেই প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে মহালয়া উপলক্ষে লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর ঢল নামবে এই গঙ্গাসাগরে ইতিমধ্যে প্রশাসনের তরফ থেকে চলছে জোর কদমে প্রস্তুতি।