প্রতিরক্ষা দুর্বলতাই সব চেয়ে বড় পাপ
প্রণব গুহ
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'স্ট্রেন্থ ইজ লাইফ, উইকনেস ইজ ডেথ'। অর্থাৎ শক্তিই জীবন, দুর্বলতাই মৃত্যু। স্বামীজী মনে করতেন, নিজেকে দুর্বল মনে করা বা নিজের ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস না রাখাই সবচেয়ে বড় পাপ। এর কারণ কি? উত্তর দিয়ে গিয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বলেছিলেন, 'এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি। রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি'। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বর্তমানে ঠিক এটাই চলছে, দুর্বলের ওপর সবলের উৎপীড়ন। ইউক্রেনের উপর রাশিয়া, গাজার উপর ইসরায়েল, ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরায়েল, সর্বত্র এই একই খেলা। যারা বর্তমানে সংঘর্ষে জড়িয়ে নেই তারাও হয়তো নজর রাখছে অন্য কোনো দুর্বলের উপর, সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।
দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার আজকে নতুন নয়। যেদিন থেকে মনুষ্য সমাজে ধন সম্পদের দখল শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই এই খেলা চলছে। এর একটাই কারণ দুর্বলতা এবং ভারতবর্ষ এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। অনন্ত ধন, প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্ঞান ও শৌর্য থাকা সত্বেও প্রতিরক্ষায় দুর্বলতার জন্য বার বার আক্রমণের মুখে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে ভারতীয় শাসকদের। হজরত মহম্মদের মৃত্যুর ৩২ বছর পর, অর্থাৎ ৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আক্রান্ত হয় ভারতবর্ষ। মুহালিব নামে একজন এক মুসলমান সেনাপতি মুলতান প্রদেশ ভেদ বহু বন্দী নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সামান্য আক্রমণও সামলানো যায় নি। এরপর কাশিম, সবকতগীন, সুলতান মামুদ, মহম্মদ ঘোরী, কুতুবুদ্দিন, বাবর, অগুনতি পরাজয়ের ইতিহাস খোদিত হয়ে আছে ভারতে। আবার মুঘলদের দুর্বলতার সুযোগে রবার্ট ক্লাইভের হাতে সপে দিতে হয়েছে ভারতকে। ফলে নিজেদের রক্ষায় দুর্বলতা থাকলে ধন, সম্পদ, জ্ঞান, বিদ্যা, ধর্ম কিছুই কাজে লাগে না। এই কারণেই পৃথিবীর সমস্ত দেশে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয় প্রতিরক্ষা খাতে। দেশের মানুষকে খেতে দিতে না পারলেও কিনতে হয় অস্ত্র-শস্ত্র, গোলা-বারুদ। আর এই আক্রমণের কারণ যদি ধর্ম হয় তাহলে তার পরিণাম ভয়ঙ্কর। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারত আজ তাই অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করছে প্রতিরক্ষায়। এমন কুনজর না থাকলে হয়তো গরীবরা আরও সরকারি বরাদ্দের অংশীদার হত।
ইরানে এক নেতার নিরঙ্কুশ নেতৃত্বে ধর্মীয় শাসন কায়েম থাকলেও সামলানো গেল না পরিস্থিতি। প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ তেল তাদের সর্বনাশের কারণ হল প্রতিরক্ষায় দুর্বলতার কারণে। আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ক্রমশঃ তাই নতুন মাত্রা নিচ্ছে। একই ধর্মের গোষ্ঠীরা জড়িয়ে পড়ছে লড়াইতে। ইরান আমেরিকার ওপর প্রতিশোধ নিতে শিকার বানাচ্ছে অন্য মুসলমান রাষ্ট্রকে।
তারাও পাল্টা ইরান বিরোধে সামিল হচ্ছে। আমেরিকা প্রতিদিন নতুন নতুন অছিলায় ইরানকে আক্রমণ করছে। ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে না বলে ঘোষণা করলেও আক্রমণ কমছে না। অন্যদিকে, ইসরায়েল-গাজা সংঘর্ষ থমকে রয়েছে বটে কিন্তু কখন তা আবার শুরু হবে তা বলা যায় না। এদিকে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে আফগানিস্তান-পাকিস্তানে। যুদ্ধের আগুন ঘিরে ধরছে ভারতকে। ভারতের সীমানার বাইরে হলেও ইতিমধ্যে ভারত মহাসাগরে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের তাপ অনুভূত হচ্ছে। আশঙ্কিত তেলের বাজার, ধস নামছে শেয়ার বাজারে। সিঁদুরে মেঘ দেখছে ভারত।
এরই মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতিকে তার গন্তব্য লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। ২০৪৭-এ প্রকাশিত হতে হবে অমৃত ভারতকে। তাই সারা দুনিয়ায় চাই শান্তি, আর এই শান্তি আনতে পারে সবলতা। সবল শাশ্বত ভারতই হয়ে উঠুক শান্তির দূত।
admin