দেবর্ষি মজুমদার, শান্তিনিকেতন: মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদের কাছে অজন্তা গুহা চিত্র সহস্র শতাব্দীর বিস্ময়। তার অনেক অংশ নষ্ট প্রায়। তারই ট্রেসিং বা ভিত্তি চিত্র আঁকেন বিশ্ববরেণ্য শিল্পী গনেশ হালুই। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বা সর্বেক্ষণ বিভাগ তাঁকে দায়িত্ব দেয় সেই ঐতিহাসিক দেওয়াল চিত্রগুলো ট্রেসিং করার।
২৯টি গুহার চিত্রে লুকিয়ে আছে জাতকের, বুদ্ধের জীবন কাহিনী। সেখানে আছে মিথিলা রানী সিবলী ও মহাজনক বণিক সহ কতো অজানা কাহিনীর চিত্র! আজও বিস্ময় জাগায়।
১৯৫৭ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন গনেশ হালুই। ছেচল্লিশটি ভিত্তি চিত্র ছিল তাঁর সংগ্রহে। নবতিপর শিল্পী গনেশ হালুইয়ের সেই অনবদ্য সম্ভার সমৃদ্ধ করলো বিশ্বভারতীর কলাভবনের নন্দন সংগ্রহশালা। বুধবার তার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিল্পী গনেশ হালুই অসুস্থতার কারণে উপস্থিত থাকতে পারেননি ঠিকই। তবে, তাঁর মেয়ে অপরাজিতা হালুই উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চিত্র অনুসন্ধানী বা সমালোচক মৃণাল ঘোষ, কলা ভবনের অধ্যক্ষ শিশির সাহানা প্রমুখ।
বুধবার সেই অনবদ্য সৃষ্টির প্রদর্শনীর সূচনা হলো নন্দন আর্ট গ্যালারিতে। প্রদর্শনী চলবে ১৬ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। প্রদর্শনী খোলা থাকবে সকাল ১০:৩০ থেকে বিকেল ৫:০০ পর্যন্ত। শনিবার, রবিবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সব দিন খোলা থাকবে।
অপরাজিতা হালুই চক্রবর্তী বলেন, 'বাবা অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। আমি একজন গর্বিত সন্তান হিসেবে এসেছি। বাবা আসতে পারলে খুব খুশি হতেন। অজন্তা বাবার কাছে একটা আবেগ।' কলাভবনের অধ্যক্ষ শিশির সাহানা বলেন, 'আমরা এই অমূল্য শিল্প কর্ম পেয়ে গর্বিত। বিশ্ব বরেণ্য গনেশ হালুই এই ছেচল্লিশটি ভিত্তি চিত্র যত্ন করে রেখেছিলেন। উনি সেগুলো আমাদের অধ্যাপক দিলীপ মিত্রকে দেন। তিনি এগুলো বিশ্বভারতীর কলাভবনকে দান করেন।' অজন্তা গুহায় আসল চিত্রগুলোর ত্রিশ চল্লিশ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। সেই কারণে সংরক্ষণের জন্য সর্বেক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে সেই চিত্রগুলোর ট্রেসিং করার দায়িত্ব দেওয়া হয় শিল্পী গনেশ হালুইকে। যাকে হুবহু প্রতিলিপি বা ভিত্তি লিপি বলা হয়। কালের গ্রাসে একদিন হয়তো অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাবে। সেদিন অজন্তার গবেষকদের এই অজন্তার গুহাচিত্রের জন্য বিশ্বভারতীতে আসতে হবে। তাছাড়াও,
আলোর অভাবে গুহায় চিত্রগুলো ঠিক দেখা যায় না। এখানে ভালোভাবে দেখা যাবে। নন্দনে বিভিন্ন প্রখ্যাত শিল্পীর ২৪ হাজার শিল্পসৃষ্টি আছে। তার সঙ্গে থাকবে এই শিল্পকর্মগুলো।
চিত্র সমালোচক মৃণাল ঘোষ শিল্পী গণেশ হালুইকে নিয়ে একটি বই লেখার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন। শিল্পীর "টেকনিক অফ অজন্তা মূরাল" পড়ে খুবই প্রভাবিত হন মৃণাল ঘোষ। তিনি বলেন, 'গনেশ হালুই অজন্তা গুহাচিত্র নিয়ে ছয় বছর ধরে ট্রেসিং করেন। তারপর সেই বিষয়ে পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে গবেষণা করেন। ২০০৮ সালে গনেশ হালুইয়ের লেখা সম্পূর্ণ হলেও, ২০২১ সালে প্রকাশ পেয়েছে।' তার মাঝে মার্জন ও পরিমার্জন করেছেন শিল্পী।
জানা গেছে, অজন্তা গুহাচিত্র ছাড়াও পারিপার্শ্বিক মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর মৌলিক চিত্র শিল্প সৃষ্টি করেছেন গনেশ হালুই। যা ঐতিহাসিকভাবে এক অসামান্য নজির।