শুধু দরিদ্র নয়, দারিদ্রতার উৎস দেখেছেন স্বামীজী

শুধু দরিদ্র নয়, দারিদ্রতার উৎস দেখেছেন স্বামীজী

নরেন্দ্রনাথ কুলে
স্বামীজী সন্ন্যাসী অথচ তাঁর আকুলতা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। আজও তা আমাদের পথ দেখায়। কিন্তু সেই পথে আমরা হাঁটতে পারছি কিনা তার উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে আমরা যেন ক্রমশই উদাসীন হয়ে পড়ছি। তাঁর আকুলতায় মানুষের মনুষ্যত্বের উত্তরণের প্রচেষ্টা থেকে তিনি কখনো বিরত হননি। এ সম্পর্কে নিবেদিতা বলছেন, বিবেকানন্দের সমগ্র চেতনাকে প্রতি মুহুর্তে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল মানুষ বিশেষ করে দুর্বল অসহায় মানুষ। শুধু ভারতের নয়, পৃথিবীর সর্বত্র নির্যাতিত দুর্বল অসহায় মানুষদের মনুষ্যচিত অধিকার, পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ এই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, তারই জন্য তাঁর সকল চিন্তা, সকল আযাস, সকল সংগ্রাম। এ লক্ষা থেকে মুহুর্তের জন্যও কখনও তিনি বিচ্যুত হননি। কখনও তাঁর মধ্যে এ সক্ষ্যাভিমুণী প্রয়াস স্তিমিত হয়নি। বারংবার এ চিন্তার উচ্চ থেকে উচ্চতর শিখরে আরোহণ করতে তিনি অক্ষম হননি। সকল মানুষ বিশেষত যাঁরা একেবারে অবহেলিত তাঁদের কথাই বারে বারে তিনি বলেছেন। তাঁদেরকে আপন করে নিতে পেরেছেন। তাই তিনি সদর্পে বলতে পেরেছেন, ভুলিও না-নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই। এঁদের আপন করে নিতে না পারলে কোনপ্রকার কল্যাণমূলক প্রগতি সম্ভব হবে না বলেই তিনি বলেছেন। তাঁর কথায়, বিভিন্ন বর্ণের অন্তর্জন্মের দ্বারা কোনো সমস্যার সমাধান হইবে না, যদি এই বিরোধের আগুন একবার প্রবলভাবে জ্বলিয়া ওঠে, তাহা হইলে সর্ব প্রকার কল্যাণমূলক প্রগ্রতিই কয়েক শতাব্দীর জন্য পিছাইয়া যাইবে।'
সকল বিভেদের উর্ধ্বে উঠে সকল ভারতবাসীকে আপন করে নিলে তবেই ভারতের কল্যাণ। তিনি বলছেন, তুমিও কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হইয়া, সদর্পে ডাকিয়া বল-ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী; বল ভাই-ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ। আজকের সময় ও পরিবেশে ভারতের কল্যাণ নিয়ে চিৎকার হচ্ছে, কিন্তু সকল ভারতবাসী 'ভাই' এ কথার দৃঢ়তা হারিয়ে যাচ্ছে।
বিবেকানন্দ শুধু ভারতের ও ভারতবাসীর কল্যাণ চেয়েছেন তা নয়, তিনি পৃথিবীর সমস্ত
অবহেলিত মানুষদের কল্যাণ চেয়েছেন। এ সম্পর্কে নিবেদিতা যেমন বলেছেন, তেমন বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষও বলেছেন। বিপ্লবী ঘোষ বলেছেন, বিবেকানন্দ একজন সাধারণ ধর্মগুরু ছিলেন না, একজন সাধারণ সন্ন্যাসী ছিলেন না।... আমার চোখে পৃথিবীর সর্বকালের ইতিহাসে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ মানুষ-সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। পৃথিবীর যেখানে যত দরিদ্র, শোষিত, অবহেলিত মানুষ আছে সকলের বন্ধু বিবেকানন্দ। তিনি শোষিত মানুষদের কেবল কল্যাণ চেয়েছেন তা নয়। তিনি শোষিত মানুষরা কিভাবে শোষণের শিকার হচ্ছে সেদিকেও তাঁর গভীর বৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তাই তিনি শুধু একজন সাধারণ ধর্মগুরু বা সন্ন্যাসী নন। তিনি দেখিয়েছেন যে সমাজে শোষণ কেবল অর্থনৈতিকভাবে হয় না। তিনি
দেখিয়েছেন সমাজে চার রকমের শোষণ-জ্ঞান বা বিদ্যাবুদ্ধিবলে শোষণ, অস্ত্রশক্তির সাহায্যে শোষণ, অর্থনৈতিক শোষণ, শ্রম শক্তির/ সঙ্ঘবদ্ধ শক্তির শোষণ। বিবেকানন্দ বলছেন, বিশেষ সুবিধা ভোগ করিবার ধারণা মনুষ্যজীবনের কলঙ্কস্বরূপ।.. প্রথমে আসে পাশব সুবিধার ধারণা দুর্বলের উপর সবলের অধিকারের চেষ্টা। এই জগতে ধরনের অধিকারও ঐরূপ। একটি লোকের অপরের তুলনায় যদি বেশী অর্থ হয়, তাহা হইলে যাহারা কম অর্থশালী, তাহাদের উপর সে একটুকরো অধিকার স্থাপন বা সুবিধা ভোগ করিতে চায়। বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের অধিকার লিঙ্গা সৃম্মাতর এবং অধিকতর প্রভাবশালী। যেহেতু একটি লোক বেশি জানে শোনে, সেই জন্য সে অধিকতর সুবিধার দাবি করেক্ষ। সর্বশেষ এবং সর্বনিকৃষ্ট অধিকার হইল আধ্যাত্মিক সুবিধার অধিকার। যাহারা মনে করে আধ্যাত্মিকতা বা ঈশ্বর সম্বন্ধে আমরা বেশী জানি, তাহারা অন্যের উপর অধিকতর দাবি করে।..
অধিকতর সুবিধাভোগী দাবিদারের কাছে দরিদ্রদের পরিশ্রম অত্যন্ত অবহেলিত
যা শোষণের চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যার ফলে দরিদ্র আরও দরিদ্রের পাঁকে নিমজ্জিত হচ্ছে এবং ধনী আরও ধনবান হয়ে উঠছে, এই পার্থক্য তিনি উপলব্ধি করেছেন বলে বিপ্লবী ভূপেন্দ্র দত্ত বলেছেন। বিবেকানন্দ বলছেন, ঐ যারা.. বিজাতিবিজিত স্বজাতিনিন্দিত ছোট জাত, তারাই আবহমানকাল নীরবে কাজ করে যাচ্ছে, তাদের পরিশ্রমফলও তারা পাচ্ছে না! ছোট জাত পরিশ্রমের ফল পাচ্ছে না, শুধু সেদিকে তার নজর ছিল তাই নয়। সারা দেশের শ্রমজীবীর নীরব পরিশ্রম যাদের আধিপত্য ও ঐশ্বর্য বাড়িয়েছে সেদিকেও খেয়াল করেছেন। তিনি বিস্ময়ের সাথে প্রকাশ করেছেন, হে ভারতের শ্রমজীবী! তোমার নীরব অনবরত নিন্দিত পরিশ্রমের ফলস্বরূপ বাবিল, ইরান, আলেকজেন্দ্রিয়া, গ্রীস, রোম, ভেনিস, জেনোয়া, বোগদাদ, সমরকন্দ, স্পেন, পোর্তুগাল, ফরাসী, সিনেমার, ওলন্দাজ ও ইংরেজের ক্রমান্বয়ে আধিপত্য ও ঐশ্বর্য লাভ করেছে। আরও বলছেন যে যাঁরা এসব দেখেও দেখে না, অথচ এঁদের পয়সায় শিক্ষিত তাদেরকে তিনি দেশদ্রোহী হিসেবে দেখেন। বলছেন, যতদিন ভারতের কোটি কোটি লোক দারিদ্র্য আর অজ্ঞানান্ধকারে ডুবে রয়েছে, ততদিন তাদের পয়সায় শিক্ষিত অথচ যারা তাদের দিকে চেয়েও দেখছে না, এরূপ প্রত্যেক ব্যক্তিকে আমি দেশদ্রোহী বলে মনে করি।
দরিদ্র মানুষের অবস্থা দেশে দেশে চলমান
ব্যবস্থায় কল্যাণময় হয়ে উঠতে যে পারে না তা তিনি লক্ষ্য করেছেন। শোষণযন্ত্রটা কাদের হাতে তা তিনি স্পষ্ট করেছেন-যাদের হাতে টাকা, তারা রাজ্যশাসন নিজেদের হাতের মুঠোর ভেতর রেখেছে, প্রজাদের লুঠছে, শুষছে, তারপর সেপাই করে দেশ-দেশান্তরে পাঠাচ্ছে, জিত হলে তাদের ঘর ভবে ধনধান্য আসবে। আর প্রজাগুলো তো সেইখানেই মারা গেল। শাসন হাতের মুঠোয় থাকা শক্তিমান পুরুষেরাই সমাজকে চালাচ্ছে বলে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। বলছেন, ও তোমার পার্লামেন্ট দেখলুম, সেনেট দেখলুম, ভোট ব্যালট মেজরিটি দেখলুম, রামচন্দ্র। সব দেশেই ঐ এক কথা। শক্তিমান পুরুষরা যেদিকে ইচ্ছে সমাজকে চালাচ্ছে, বাকিগুলো ভেড়ার দল।
বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী হয়েও শোষিত মানুষ ও শোষণের চেহারার গভীরে যেভাবে দৃষ্টিপাত করেছেন, তাঁর সেই দৃষ্টিপাত থেকে আমরা যেন আজ ক্রমশ দৃষ্টিচ্যুত হয়ে চলেছি। তাঁর দৃষ্টিতে শোষণের চার রাপ থেকে মানুষ কি মুক্ত হতে পেরেছে? আজকে সুবিধাভোগীদের চেহারা সে কথা বলে না। তাই ভেড়ার দল আর শক্তিমান পুরুষের চেহারার পার্থক্য আরও যেন দ্রুত প্রকট হচ্ছে।