ক্যানিংয়ে পালিত হল সুন্দরবন দিবস 

ক্যানিংয়ে পালিত হল সুন্দরবন দিবস 
সুভাষ চন্দ্র দাশ, ক্যানিং; বৃহষ্পতিবার সকালে সুন্দরবনকে রক্ষা করার শপথ নিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ক্যানিংয়ের বন্ধুমহল অডিটোরিয়াম হলে পালিত হল সুন্দরবন দিবস।তার আগে ক্যানিং পশ্চিমের বিধায়ক পরেশ রাম দাসের নেতৃত্বে এক পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ক্যানিং বাসষ্ট্যান্ড থেকে বন্ধুমহল পর্যন্ত।  এদিন অনুষ্ঠানে কৃতি ছাত্র-ছাত্রী সহ বিশিষ্টজনদের কে সংবর্ধনা দেওয়া হয় অনুষ্ঠান মঞ্চে।এছাড়াও কি ভাবে সুন্দরবন কে রক্ষা করা যায় সেবিষয়ে বিশিষ্টরা তাঁদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। পাশাপাশি সকল ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে সুন্দরবন বিষয়ক কবিতা,ছড়া এবং অঙ্কন প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্যানিং পশ্চিমের বিধায়ক পরেশরাম দাস,ক্যানিং ১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি উত্তম দাস,ক্যানিং ১ বিডিও নরোত্তম বিশ্বাস,ক্যানিং মহকুমা পুলিশ আধিকারীক রাম কুমার মন্ডল,বিশিষ্ট সুন্দরবনপ্রেমী শিক্ষক সুকুমার পয়ড়া,বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ক্ষীতিশ বিশাল,জেলাপরিষদ সদস্য সুশীল সরদার,ক্যানিং ১ পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ অরিত্র বসু,শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ প্রদ্যূৎ রায় সহ ক্যানিং মহকুমার বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র ছাত্র সহ শিক্ষক শিক্ষিকারা। 
উল্লেখ্য বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ তথা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণ ভূমি সুন্দরবন।এই সুন্দরবন নাম নিয়ে বিরাট মত পার্থক্য দেখা যায়। কেউ কেউ বলে থাকেন সুন্দরী গাছের নাম থেকে সুন্দরবন নাম। সুন্দরবন নাম নিয়ে মত বিরোধ রয়েছে এবং যুক্তিবাদীরা নাও মানতে পারেন কিন্তু বিভিন্ন গবেষকদের স্বীকৃত সত্য ঘটনা হিসাবে রামায়ন,মহাভারত,পূরাণ এর মতামত অনুযায়ী সুন্দরবনের প্রথম নাম ছিল “শাক দ্বীপ” পরে নাম করণ হয় “গঙ্গারিনী” আরো জানা যায় “পৌন্ড্র বর্ধণ” নাম ছিল। আর বাংলাদেশে “সুগন্ধা” নদীর নাম অনুযায়ী সুন্দরবন নাম হয়।আবার অনেকেই বলে থাকেন সুন্দরবনের গাছ,নদীনালা জীবন বৈচিত্রের জন্য সুন্দরবন নাম।
উল্লেখ্য সুন্দরবনের মোট বনাঞ্চল ১০৮১৩ বর্গ কিমির মধ্যে ৪৭২৬ বর্গ কিমি ভারতীয় ভূখন্ডের,অর্থাৎ সুন্দরবনের ৩৮ শতাংশ ভারতের এবং ৬২ শতাংশ বাংলাদেশের অধীনে। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট(বিশ্ব সম্পদ)” ঘোষনা করেন এবং একই বছরে ২৯ মার্চ “ম্যান এন্ড বায়োষ্ফিয়ার(জীব পরিমন্ডল)” ঘোষনা হয়। সুন্দরবনের মোট ১০২টি দ্বীপ,এর মধ্যে ৫৪ টি দ্বীপে জনবসতি এবং ৪৮ টি দ্বীপ নিয়ে ম্যানগ্রোভ বন ও বন্যপ্রাণী। উত্তর২৪পরগণার জেলার ৬টি ব্লক ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ১৩টি ব্লক নিয়ে সুন্দরবন। সবথেকে বেশী দ্বীপ রয়েছে পাথরপ্রতিমা ব্লকে ১৩ টি,গোসাবায় ৯টি,নাখানায় ৫টি,সন্দেশখালিতে ৬টি,হাড়োয়া ব্লকে ৫টি। সুন্দরবনের নদীগুলি লবনাক্ত জলে পরিপুষ্ট। রায়মঙ্গল,হরিণভাঙা,গোসাবা,মাতলা,বিদ্যাধরী,ঝিলা,করতাল,ঠাকুরান,সপ্তমূখী,মুড়ীগঙ্গা,গাবতল,মৃদঙ্গভাঙা,আজমলমারি,ঢুলিভাসানি,চুলকাটি,বেলেডোনা,পেইলি,হেড়োভাঙা,মনি,বেনিফেলী,গোমর,পিয়ালি,বেলেডোনা নদীগুলি জোয়ারের জলে পুষ্ট। ১৫৫৮ সালের ৬মে থেকে ৩১জুলাই ২০২৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের উপর প্রায় ৩৬ বার প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে। উল্লেখ্য ১৫৫৮ সালে ৬মে  টানা পাঁচঘন্টা দমকা ঝড়ে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আবার ২৫মে ২০০৯ সালে আয়লায় ১১০কিমি বেগে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের ৩৫০০কিমি নদী বাঁধের ৭৭৮কিমি নদীবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং ১৭৮কিমি নদীবাঁধ পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ১৯০৩ সালে উদ্ভিদ বিঞ্জানী ডেভিড প্রেইন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছের উপর গবেষণা করেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বের ৫০ টি বৃক্ষজাতীয় ম্যানগ্রোভ রয়েছে এর মধ্যে সুন্দরবনে ২৪টি রয়েছে। এছাড়া ও ১৬৫টি শৈবাল, ১৩ টি অর্কিড উদ্ভিদ রয়েছে এই সুন্দরবনে । সুন্দরী,কাঁকড়া,ধুঁদুল,গরাণ,কেওড়া,গর্জন,কৃপা,তোড়া,ওড়া,পশুর,হেতাল প্রভৃতি গাছ রয়েছে।
রয়েছে পৃথিবী বিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার,মেছো বিড়াল,বনবিড়াল,হরিণ,শূকর,ভোঁদড়,শুশুক,কুমীর,কচ্ছপ,খেঁকশিয়াল,তাড়খেল,স্বর্ণ গোধিকা,বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ শঙ্খচূড়,গোখরো, কালাচ,কেউটে,এবং বাজ,পেঁচা,নীলকন্ঠ,মোহন চুড়া,শামুখ খোল,গাঙচিল,ডাহুক পাখি সহ নানান প্রজাতির জীবজন্তুর বসবাস সুন্দরবনে।
বৈঞ্জানিকদের দাবী বিশ্ব বিশ্বউষ্ণায়ণের  কবলে পড়ে সুন্দরবন ধ্বংসের পথে। সেই সুন্দরবন কে অক্ষত রাখতে পালন করা হয় সুন্দরবন দিবস।প্রাকৃতিক রুপেগুণে অলৌকিক ভাবে ভরপুর বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ  এই ম্যানগ্রভ অরণ্য সুন্দরবন। যার জন্য পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন ভ্রমণ করতে আবার কেউবা আসেন সুন্দরবনের ইতিহাস তুলে ধরে গবেষণা করতে।প্রাকৃতিক রুপের এক বৈচিত্রময় নদী-জঙ্গল ঘেরা বাদাবন এই ব-দ্বীপ সুন্দরবন।হে সুন্দরবন তুমি কত অলৌকিক!সুন্দরতম সুন্দরবন।সেই সুন্দরবন কে রক্ষা করার শপথ নেওয়া হয় এদিন অনুষ্ঠান থেকে।