জমিদারি চলে গেলেও আজও নিয়ম মেনে পুজো চলে আসছে দক্ষিন বারাসতের বসু জমিদার বাড়িতে
১৭২৫ সালে বাংলার গভর্নর লর্ড ক্লাইভের হাত ধরে জমিদারি উত্থান। তৎকালীন সময়ে অবিভক্ত বাংলায় বাংলাদেশ থেকে কৃষ্ণ চন্দ্র বসুকে দক্ষিণ বারাসাতে নিয়ে আসে লর্ড ক্লাইভ।দেওয়ানি ব্যবস্থায় বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ বারাসতে বেশ কিছু অঞ্চলের দেওয়ানি পান কৃষ্ণচন্দ্র বসু ৷ প্রতিষ্ঠা করেন প্রাসাদোপম বসত বাড়ি ৷ শোনা যায়, তিনি নাকি শরতে দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান। তৈরি হয় শিবের মন্দির এবং শুরু হয় দুর্গাপুজো ৷ সেই থেকে চলে আসছে ৷ বর্তমান প্রজন্ম সেই রীতি অনুযায়ী দুর্গাপুজো চালিয়ে যাচ্ছেন ৷ কৃষ্ণ চন্দ্র বসুর জমিদারির সময়কালে দুর্গাপুজোতে আমন্ত্রিত হতেন ব্রিটিশ আধিকারিকেরা । তাঁর আতিথেয়তায় প্রসন্ন হয়ে কৃষ্ণচন্দ্র বসুকে 'রাজা' উপাধি দেয় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ।স্বাভাবিক ভাবে সুবিশাল বাড়ি এখন জরাজীর্ণ ৷ পুজোর আয়োজনের জৌলুসও কমেছে, কিন্তু কালের গর্ভে তলিয়ে যায়নি ৷ অতীতে জমিদারের অধীনস্থ প্রজাদের বর্তমান প্রজন্মও বসু বাড়ির পুজোয় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পুজোর আয়োজনে হাত লাগায় । কৃষ্ণ নবমী থেকে এই পুজোর শুভ সূচনা হয়। টানা ১৫ দিন ধরে এই বসু পরিবারে চলে দুর্গাপুজো। ৩০০ বছরে প্রাচীন ঐতিহাসিক এই পুজো।পুজোর বিশেষত্ব পঞ্চমীতে নয়, ১৫ দিন আগে থেকে দেবীর দুর্গার বোধন শুরু হওয়ার রীতি । পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে পুজো করেন পুরোহিতেরা, জানালেন বর্তমান প্রজন্মের সদস্য সায়ন্তন বসু ৷ অতীতের ৭টি ছাগল বলির এখনও বহাল রয়েছে । বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরি করে আসছে মৃৎশিল্পীরা । পুজোর সময় ডাক পড়ে ঢাকিদের । এই পুজোয় বিশেষত্ব হলো এই পুজোতে বসু পরিবারে কোনো মহিলা সদস্যরা কাজ করে না । এখনো পর্যন্ত বংশ-পরম্পরায় এই পুজোয় সমস্ত রকম কাজ প্রথা মেনে প্রজারা করে আসছে। এখনো পর্যন্ত দুর্গাপুজোর সময় প্রজারা। ঐতিহাসিক এই বসু পরিবারে তৎকালীন আমন্ত্রিত থাকাতো ব্রিটিশরা। পুজোর দিনগুলিতে বসু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মাতৃ আরাধনায় মেতে উঠতো ব্রিটিশরা। এ বিষয়ে বসু পরিবারের সদস্য সায়ন্তন বসু জানান, লর্ড ক্লাইভের আমলে আমাদের পূর্বপুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র বসু অবিভক্ত বাংলাদেশ থেকে তিনি এই দক্ষিণ বারাসাতে এসে জমিদারি আধিপত্য স্থাপন করেন। স্বপ্নাদেশের পর এই পরিবারের শুরু হয় দুর্গাপুজো তৈরি করা হয় সুবিশাল দালান বাড়ি এবং মন্দির। আমাদের এখনো পর্যন্ত বলিদান প্রথা রয়েছে। ১৫ দিন ধরে আমাদের এই দুর্গা পুজো চলে। বিশাল প্রাসাদ এখন জরাজীর্ণ অবস্থা আগের সেই মন্দির সেই মন্দির ও কালের নিয়মে ভেঙে গিয়েছে। নতুন করে মন্দির সংস্কারের কাজ আমরা শুরু করেছি।পুজোর দিন গুলি বসু পরিবারের যে সকল সদস্য কর্মসূত্রে ভিন রাজ্যে কিংবা দেশের বাইরে রয়েছে তারাও পূজার দিনগুলিতে বাড়িতে চলে আসে। সবকিছুই নতুন করে গড়ে তুলছেন তাঁরা ৷কার্যত পুজোর দিনগুলি পরিবারের সদস্যদের সাথে এবং প্রজাদের সাথে আনন্দে কাটে আমাদের।এ যুগেও প্রাচীন ঐতিহ্যকে বজায় রাখার চেষ্টা করছে একুশ শতকের প্রজন্ম । বর্তমান প্রজন্মের সুমন্ত বসু বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র বসু এই পুজোর শুভ সূচনা করেছিল। তারপর থেকে পূর্বপুরুষের হাত ধরে বংশ পরম্পরায় এই পুজো চলে আসছে। বর্তমানে আমরা এই পুজোর দায়িত্বভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছি। অতীতের জৌলুসে কিছুটা ভাটা পড়লেও এখনো পর্যন্ত প্রাচীন রীতিনীতি বহাল রয়েছে এই পুজোতে। আর পাঁচটা পুজোর থেকে আমাদের এই পুজো একটু আলাদা ১৫ দিন ধরে এই পুজো চলে।আমাদের পুজো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র বসু ৷ তারপর কেশবচন্দ্র বসু, রাধানাথ বসু, গৌরীচন্দ্র বসু, দুর্গাদাস বসু ৷ একসময় এক মণ চালের নৈবেদ্য দেওয়া হত ৷ এখন ৪০-৫০কিলো চালের নৈবেদ্য হয় ৷ নবমীর দিন বিকেলে পরিবার, বন্ধু, পাড়ার সবাইকে নৈবেদ্য আর পাঁঠার মাংস প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়, জানালেন বসু পরিবারের মেয়ে ৷ মা চণ্ডীর ঘটে ১হাজার বেলপাতা, ১ হাজার তুলসী পাতা দিতে হয় ৷ হোমের আগুনও ৫ দিন ধরে একভাবে জ্বলতে থাকে আলাদা একটি ঘরে ৷ অতীতে পালাগান ও কবিয়ালের আসরও বসত এই বাড়িতে । অতীতের সেই , জৌলুস আমরা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।
admin