ঢাক বাজিয়ে স্বনির্ভরতার পথে চাঙ্গুরিয়ার মহিলারা
অভীক মিত্র,সিউড়ি : সিউড়ি একনং ব্লকের চাঙ্গুরিয়া গ্রামের দাসপাড়ার নাম বললে হয়তো অনেকেই একবার থমকে যাবে কিন্তু ‘মহিলা ঢাকিদের গ্রাম’ বললেই পথ দেখিয়ে দিতে পারবে আশপাশের মানুষ । কারণ এই গ্রামের পরিচয় এখন আর শুধু মাটির রাস্তা, খেতখামার কিংবা পাড়ার নামের মধ্যে আটকে নেই । কয়েকজন মহিলার কাঁধে ঝোলানো ঢাক আর তার তালে তালে এগিয়ে চলা তাঁদের জীবনই বদলে দিয়েছে গ্রামের পরিচয় । তাঁদের বাজানো ঢাকের শব্দ এখন পৌঁছে যায় বীরভূম জেলার গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্যের নানাপ্রান্তে । আর সেই সঙ্গে চাঙ্গুরিয়া দাসপাড়ার নামও ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে । অথচ বছর দশেক আগেও এমনটা কল্পনা করা যেত না । সংসারের অভাব মেটাতে গ্রামের মেয়েদের কেউ নির্মাণকাজে যোগানদারের কাজ করতো কেউ মাঠে দিনমজুরি করতো আবার কেউ বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করতো । কাজ ছিল,পরিশ্রম ছিল কিন্তু সেই পরিশ্রমের সঙ্গে পরিচয় বা সম্মানের জায়গাটা ছিল না বললেই চলে । সেই জায়গাতেই বদলের প্রথম আওয়াজটি তুলেছিল পাশের গাংটে গ্রামের ঢাকি ভবেশ দাস । তাঁর ভাবনাটা ছিল সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে । মেয়েরা যদি পুরোহিতের কাজ করতে পারে,জীবনের নানা ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যেতে পারে তাহলে ঢাক বাজানোর ক্ষেত্রেই বা তাঁদের অযোগ্য ভাবা হবে কেন—এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর উদ্যোগ । প্রথমে প্রস্তাবটি শুনে অনেকেরই হয়তো সংশয় ছিল কিন্তু ভবেশবাবু শুধু পরামর্শ দিয়েই থেমে থাকে নি । নিজের অভিজ্ঞতা উজাড় করে দিয়ে বিনামূল্যে তাঁদের ঢাক শেখাতে শুরু করে । এক দু’জন করে কয়েকজন মহিলা এগিয়ে এল । হাতে উঠল ঢাকের কাঠি । শুরু হল তাল,লয় আর ছন্দের কঠিন অনুশীলন । ভুল হয়েছে,হাত ব্যথা করেছে, তাল কেটেছে—তবু থামে নি তাঁরা । দিনের কাজ সেরে,সংসারের দায়িত্ব সামলে চলেছে প্রশিক্ষণ ।ভবেশ দাসের কথায়, ‘‘মেয়েরা এখন সবকাজেই এগিয়ে এসেছে । মেয়েরা পুরোহিতের কাজও করছে । তাহলে ঢাক বাজানোর কাজে পিছিয়ে থাকবে কেন ? এই ভাবনা থেকেই ওদের শেখাতে চেয়েছিলাম । ওরাও খুব আগ্রহ নিয়ে শিখেছে । এখন সারাবছর বিভিন্ন জায়গা থেকে ওদের জন্য বুকিং আসে । এটা আমার কাছেও গর্বের ।’’ কয়েক বছর অনুশীলনের পরে স্থানীয় অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁদের পথচলা । ধীরে ধীরে ডাক আসতে থাকে জেলার বাইরে থেকেও । এখন বহরমপুর, বর্ধমান সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পুজো,অনুষ্ঠান কিংবা উৎসবের আসরে ঢাক বাজাতে যান ভাগ্য দাস,বসুমতি দাস,মনখুশি দাসদের দল । একসময় যে হাতে সংসারের খরচ জোগাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হত,সেই হাতেই এখন ঢাকের কাঠি । সেই কাঠির প্রতিটি আঘাত যেন নিজেদের ভাগ্য বদলেরও ঘোষণা ।ভাগ্য দাসের জীবনে এই পরিবর্তনের মূল্য আরো গভীর । দুই সন্তান ছোট থাকতেই স্বামীকে হারিয়েছে । সংসারের হাল ধরতে তখন যে কাজ সামনে এসেছে সেটাই করেছে । তাঁর কথায়, ‘‘ঢাক বাজানো শিখতে না পারলে হয়তো এখনো মানুষের বাড়ি কাজ করেই সংসার চালাতে হতো । এখন শুধু রোজগার নয় একটা সম্মানও পেয়েছি । দূরের জায়গা থেকে ডাক আসে । সবচেয়ে ভালো লাগে আমাদের নামেই মানুষ গ্রামের পরিচয় দেয় ।’’ বসুমতি বা মনখুশিদের কাছেও ঢাক এখন নিছক বাদ্যযন্ত্র নয় । সেটাই তাঁদের আত্মপরিচয়ের অংশ । সংসার সামলে, সামাজিক বাধা পেরিয়ে, দীর্ঘ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছে—সুযোগ পেলে গ্রামের মেয়েরাও নিজেদের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করতে পারে । তাঁদের সাফল্য দেখে এলাকার অন্য মেয়েদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ ।তাই চাঙ্গুরিয়ার দাসপাড়া এখন আর নিছক একটি পাড়া নয় । কোনো অপরিচিত মানুষ সেখানে গিয়ে ‘মহিলা ঢাকিদের গ্রাম’ বললেই যে দরজা খুলে যায়,সেই পরিচয়ের পিছনে রয়েছে একদল মহিলার ঘাম,সাহস আর নিরন্তর লড়াই । আর রয়েছে ভবেশ দাসের সেই দূরদর্শী ভাবনা—যে ভাবনা একদিন কয়েকজন মহিলার হাতে তুলে দিয়েছিল ঢাক আর আজ সেই ঢাকের তালেই বদলে দিয়েছে গোটা গ্রামের পরিচয় ।
admin