সুভাষ চন্দ্র দাশ, ক্যানিং : শুক্রবার একদিকে বারুইপুরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জনসভা, সেখানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। অন্যদিকে একটি ফোন, আর তাতেই বদলে গেল সব পরিকল্পনা। মুখ্যমন্ত্রীর সভায় যাওয়া বাতিল করে বিষধর কালাচ সাপের হাত থেকে এক আতঙ্কিত পরিবারকে রক্ষা করলেন ক্যানিং-এর পরিচিত সর্প-উদ্ধারকারী কর্ণ নস্কর। তাঁর এই মানবিক সিদ্ধান্তকে কুর্নিশ জানাচ্ছে গোটা এলাকা।
ঘটনাটি ঘটেছে ক্যানিং থানার অন্তর্গত দাঁড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের গোবরামারি গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে খবর,শুক্রবার সকাল থেকেই বারুইপুরে মুখ্যমন্ত্রীর জনসভায় যোগদানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ক্যানিং এলাকার যুবক কর্ণ নস্কর। কর্ণ শুধু একজন সাধারণ বিজেপি কর্মীই নন, তিনি এলাকায় সাপ উদ্ধারকারী হিসেবেও অত্যন্ত পরিচিত। বহু বাড়ি থেকে বিষধর সাপ উদ্ধার করে বনদপ্তরের হাতে তুলে দিয়ে বহু প্রাণ বাঁচিয়েছেন তিনি।
এদিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি যখন উত্তরভাগ এলাকা পর্যন্ত পৌঁছেছেন, ঠিক তখনই তাঁর ফোনে পরপর ফোন আসতে থাকে। ফোনের ওপারে গোবরামারি গ্রামের রাকেশ বৈদ্যের বাড়ি থেকে এক উদ্বেগভরা কণ্ঠ। পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে কাঁপছেন - "দাদা, বাড়ির ভিতরে কালাচ সাপ ঢুকে পড়েছে, দয়া করে তাড়াতাড়ি আসুন, উদ্ধার করে নিয়ে যান। বাচ্চারা ভয়ে কান্নাকাটি করছে।"
কালাচ সাপ! নাম শুনলেই আতঙ্ক। এই সাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক বা সাইলেন্ট কিলার। রাতে ঘুমের মধ্যেই কামড় দেয়, টেরও পাওয়া যায় না। এই সাপের কামড়েই সুন্দরবন এলাকায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়।
ফোনটা পেয়েই এক মুহূর্তও দেরি করেননি কর্ণ নস্কর। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর সভা, যেখানে যাওয়ার জন্য তিনি সকাল থেকে প্রস্তুত, অন্যদিকে একটি পরিবারের জীবন-মরণ সমস্যা। মানবিকতাকেই বেছে নিলেন তিনি।
তড়িঘড়ি বারুইপুরে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেন কর্ণ। বাইক ঘুরিয়ে সোজা ছুটে যান গোবরামারি গ্রামে রাকেশ বৈদ্যের বাড়িতে।
সেখানে গিয়ে দেখেন, বাড়ির মধ্যে একটি মেচলায় কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে একটি পূর্ণবয়স্ক বিষধর কালাচ সাপ। বাড়ির লোকজন ভয়ে অন্য ঘরে আশ্রয় নিয়েছে।
এরপর নিজের অভিজ্ঞতা এবং সরঞ্জাম দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে, দক্ষ হাতে সেই কালাচ সাপটিকে উদ্ধার করেন। প্রায় ২০ মিনিটের চেষ্টায় সাপটিকে একটি নিরাপদ পাত্রে বন্দি করেন তিনি। উদ্ধারের পরই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রাকেশ বৈদ্যের পরিবার।
কর্ণ নস্কর জানিয়েছেন, সাপটিকে বনদপ্তরের হাতে তুলে দেবেন, যাতে সাপটিকে নিরাপদ জায়গায়, জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই বিষয়ে কর্ণ নস্কর বলেন, "মুখ্যমন্ত্রীর সভা তো বছরে অনেকবার হয়, কিন্তু ওই পরিবারটা তখন চরম আতঙ্কে ছিল। যদি সাপটা কাউকে কামড়ে দিত, তাহলে সারাজীবন আফসোস থেকে যেত। তাই সবার আগে মানুষের প্রাণ বাঁচানো জরুরি মনে হয়েছে। সভায় পরে যাওয়া যাবে, আগে পরিবারটাকে বাঁচানো দরকার ছিল।"
কর্ণ নস্করের এই মানবিক কাজে প্রশংসায় পঞ্চমুখ গোবরামারি সহ গোটা দাঁড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মানুষ। মুখ্যমন্ত্রীর সভা বাতিল করে আমাদের জন্য ছুটে এসেছেন, এটা আমরা কোনওদিন ভুলব না।"