দেবর্ষি মজুমদার, বীরভূম: পৌষ সংক্রান্তি অর্থাৎ মকরের স্নানের আগের রাত হলো পৌষ আগলানোর রাত। মেঠো গ্রাম বাংলার এই ইতিহাস চিরায়ত কতদিন থাকবে, তা একমাত্র বলতে পারে কালের গতি। আজও গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে এই রাতে মাঙ্গলিক উলুধ্বনি ও শঙ্খ ধ্বনি শোনা যায়। এই রাতটিতে পৌষকে বাউড়ি বেঁধে না আগলালে পৌষ পালিয়ে যেত। আর এই বিজোড় বাউড়ির জোরাজুরিতে নাকি আরেকটি দিন থেকে যায়। এই অনাবিল নির্মল বিশ্বাস আজও পালিত বঙ্গনারীর হৃদয়ে।
তাই তো নতুন ধানের চালের গুড়ি, সিঁদুর সহ চুলের বিনুনি’র মতো করে খড়কে পেঁচিয়ে তার সাথে সরষের ফুল, মুলো ফুল, শিমের ফুল, আম পাতা দিয়ে ‘বাউরি বন্ধনে' রাখা হয়। বাউরির দড়ি বাম হাতে পাকাতে হয়। আর গৃহবধূরা মাঙ্গলিক ধ্বনি দিয়ে সুর করে গেয়ে ওঠেন- “এসো পৌষ যেও না জন্ম জন্ম ছেড়ো না, আঁধারে-পাঁদারে পৌষ, বড়ো ঘরের কোণে বোস। পৌষ এল গুড়ি গুড়ি, পৌষের মাথায় সোনার ঝুড়ি।” আবার কোথাও কোথাও শোনা যায়--এসো পৌষ, বসো পৌষ, না যেও ছাড়িয়ে / ছেলেপুলে ভাত খাবে সোনার থালা ভরিয়ে। শেষ পৌষের রাতের কথা যেন রবি কবির কথায় ধ্বনিত- “পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়। ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে, মরি হায় হায় হায়…”
পাঁচালি পড়ার ঢঙে সুর করে মায়ে ঝিয়ের গলায় শোনা যায়। আধুনিকতার ছোঁয়াচ এড়িয়ে আজও গ্রাম বাংলা ধরে রেখেছে পৌঁষ আগলানোর উৎসব। ওই উৎসব পালনের জন্য এদিন সকাল থেকেই কার্যত গ্রামে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।
গ্রামাঞ্চলে আরেকটি কথা বহু শ্রুত, "পৌষমাসে ইঁদুরেরও সাতটা মাগ( স্ত্রী)।" অর্থাৎ ওই সময় একটি ইঁদুরেরও সাতটি স্ত্রীর ভরণপোষণ করার ক্ষমতা রাখে। ওই সময় মাঠে থেকে ধান ওঠে। ইঁদুর সেই ধান গর্তে সঞ্চয় করে রাখে। তা দিয়েই সে তার স্ত্রীদের প্রতিপালন করে। অর্থাৎ এই সময় হলো শ্রীবৃদ্ধির সময়। পৌষ মাস লক্ষ্মীর মাস।' তাই এই পৌষ বিদায় নিলে গৃহ লক্ষ্মীরা দুঃখিত হবেন এটাই তো স্বাভাবিক।