বিশ্বভারতীর আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে গ্যাস সংকটের ছায়া, কাঠে রান্না ঘিরে রাজনৈতিক তরজা

বিশ্বভারতীর আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে গ্যাস সংকটের ছায়া, কাঠে রান্না ঘিরে রাজনৈতিক তরজা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইতালি যাত্রার শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে সোমবার বিশ্বভারতীতে ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন, আন্তর্জাতিক উপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক আবহে ভরপুর এক বিশেষ অনুষ্ঠান। তবে এই মর্যাদাপূর্ণ উদযাপনের মাঝেই সামনে এল এক অস্বস্তিকর বাস্তব চিত্র—অতিথিদের জন্য খাবার প্রস্তুত করতে গিয়ে গ্যাসের অভাবে কাঠ ও কয়লায় রান্না করতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠল স্থানীয় ক্যাটারারদের তরফে। ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে জ্বালানি সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে।
উল্লেখ্য, ১৯২৬ সালের এই দিনেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উদ্দেশ্যে ইতালি যাত্রা করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার শতবর্ষ উপলক্ষে বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতন চত্বরে সোমবার আয়োজিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইতালির প্রতিনিধি দলও, ফলে এই উদযাপন আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, স্মৃতিচারণ ও বিশেষ পর্বে দিনভর উৎসবের আবহে মুখর ছিল গোটা প্রাঙ্গণ।
কিন্তু উৎসবের এই আবহের মধ্যেই সামনে আসে অন্য এক বাস্তবতা। অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য রান্নার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ক্যাটারার কৌশিক পালের অভিযোগ, তীব্র গ্যাস সংকটের জেরে নির্ধারিত ব্যবস্থায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে কাঠ ও কয়লার সাহায্যে রান্না করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, বাজারে সহজে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, অনেক জায়গাতেই পর্যাপ্ত সিলিন্ডারের অভাব দেখা দিচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হয়েছে।
কৌশিক পাল বলেন, “চারিদিকে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। বাজারে সহজে গ্যাস মিলছে না। কোথাও পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে কাঠ ও কয়লার সাহায্যে রান্না করতে হয়েছে। এতে খরচ কিছুটা কম হলেও পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক নয়।”
যদিও এই অভিযোগ নিয়ে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ দায় এড়িয়েছে। বিশ্বভারতীর ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ বলেন, “এটি সম্পূর্ণভাবে ক্যাটারারের ব্যক্তিগত সমস্যা। বিশ্বভারতীর তরফে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা হবে না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ একাধিক জায়গা থেকে উঠে আসছে। ছোট ব্যবসায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক এবং ক্যাটারিং পরিষেবার সঙ্গে যুক্তদের একাংশের দাবি, এর জেরে তাঁদের পরিষেবা দিতে যেমন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, তেমনই খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্যাস নীতির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। দলের দাবি, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের প্রভাব এখন শুধু সাধারণ পরিবারেই নয়, বড় সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় কেন্দ্রকে কটাক্ষ করে বলেন, “এখনকার দিনে কয়লা বা কাঠের উনুন প্রায় উঠে গেছে। অথচ একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে সেই চিত্রই দেখা গেল। মোদী বাবুর উজ্জ্বলা যোজনার মতো প্রকল্প নিয়ে বড় বড় প্রচার হলেও বাস্তবে সবই ধাপ্পাবাজি। এভাবে চলতে থাকলে সামনে আরও দুর্দিন আসবে।”
একদিকে রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক স্মৃতিচারণ, অন্যদিকে আধুনিক জ্বালানি ব্যবস্থার সংকট—এই দুই বিপরীত ছবি সোমবার বিশ্বভারতীর অনুষ্ঠানে যেন পাশাপাশি ধরা পড়ল। আর সেই কারণেই সাংস্কৃতিক গরিমার আবহেও গ্যাস সংকটের এই অভিযোগ এখন জোরালো আলোচনার কেন্দ্রে।