সুভাষ চন্দ্র দাশ,ক্যানিং - ভোঁদড় বা উদবিড়াল আধা জলচর এবং একটি ক্ষেত্রে জলচ।এরা প্রধাণত মৎস্যভূক স্তন্যপায়ী প্রাণী। ভোঁদড় বলতে মুস্টিলিডি(Mustelidae) গোত্রের লুট্রিনি (Lutrinae) উপগোত্রের প্রাণীগুলোকে বোঝায়। যার মধ্যে রয়েছে উদবিড়াল,বেঁজি।ভোঁদড় তিন প্রজাতির।তবে এএকটি প্রজাতির দেখা মেলে।ভোঁদড় দু'রকমের,
নখরযুক্ত ভোঁদড় বা সাধারণ ভাষায় ভোঁদড়
এবং নখহীন ভোঁদড়। নখহীন ভাবা হলেও এদের আসলে নখ রয়েছে, তবে বাইরের দিকে একটু কম বেরিয়ে থাকে। এদের দেহের রং কালচে বাদামি, দেহের নিচের অংশ ময়লা হলদে। ঠোঁট ও গলার দিকের রঙ প্রায় সাদা। নখহীন ভোঁদড়ের ওজন হয় ৩ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
ভোঁদড় সাধারণত লিপ্তপদী প্রজাতীর প্রাণী। ঠিক হাঁসের পায়ের মতো আঙ্গুলগুলো পাতলাপর্দা দিয়ে জোড়া লাগানো থাকে।এদের লেজ মোটা আকারের এবং শরীর লম্বাটে গড়নের। বেশিরভাগেরই পায়ে ধারালো নখযুক্ত থাবা রয়েছে। সাঁতার কাটার সময়ে ভোঁদড়ের নাক ও কানের ফুটো বন্ধ থাকে। এদের নাকের ডগায় লম্বা গোঁফের মতো খাড়া লোম থাকে। এই গোঁফ সংবেদনশীল বলে জলের নিচে শিকার ধরতে ভোঁদড়কে খুব সহায়তা করে।এদের গোঁফ যেহেতু খাড়া, তাই জলে ভিজে গায়ে লেপ্টে যায় না, ঘোলা জলে এই স্পর্শকাতর গোঁফ শিকারের উপস্থিতি জানান দেয়। নোখহীন ভোঁদড়ের হাত-পায়ের পাতাও খুব স্পর্শকাতর। ফলে কাদায় লুকানো ঝিনুক, শামুক, চিংড়ি, কাঁকড়া এদের হাত থেকে রক্ষা পায় না। এদের শক্তিশালী ছুঁচালো দাঁত আর মাড়ি পিচ্ছিল শিকার ধরতে বা মাছের মাথা চিবোতে অত্যন্ত কার্যকর।
ভোঁদড়ের দেহে দুই স্তর লোম রয়েছে। প্রথম স্তর আকারে ছোট,কোমল এবং তাপরোধী। এই অন্তঃলোম বাতাস ধরে রেখে জলের নিচে। এদের দেহ উষ্ণ ও শুকনো রাখে। এই লোমগুলো জলরোধী। দ্বিতীয় স্তরের লোম লম্বা। এই লোমই আমাদের চোখে পড়ে, এগুলো জলে ভিজে ওঠে। এদের লেজ চ্যাপ্টা, ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি (মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত ১৮ থেকে ২২ ইঞ্চি) লম্বা। নৌকার দাঁড়ের মতো হাত-পা ,শক্ত খাড়া গোঁফ জলে শিকার করার অত্যন্ত উপযোগী। ভোঁদড় লিপ্তপদী বলে জলের নিচে খুব ভালো সাঁতার কাটতে পারে । জলের উপরে মাথা না তুলে একবারে প্রায় আধা কিলোমিটার যেতে পারে।
ভোঁদড়রা দলবেঁধে থাকলে প্রচন্ড চিৎকার করে। অধিকাংশ সময় এরা বাচ্চা সাথে নিয়ে শিকার খোঁজে। ভোঁদড়-গোত্রের অন্যান্য প্রাণীরা নিশাচর হলেও ভোঁদড় সব সময়ই কর্মতৎপর।
উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের সামুদ্রিক ভোঁদড় পাথরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এরা সামনের পা দিয়ে পাথর টেনে তুলে তার সাহায্যে শামুক,ঝিনুক এর খোলস ভেঙে থাকে।অনেক ভোঁদড় শীতল জলে বসবাস করে এবং শরীর উষ্ণ রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করে। দিনে ইউরেশিয়ান ভোঁদড়কে তাদের দেহের ওজনের ১৫ শতাংশ আর সামুদ্রিক ভোঁদড়কে তাপমাত্রাভেদে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করতে হয়।
যদিও ভোঁদড়ের মূল খাদ্য মাছ। তবে এরা অন্যান্য জলজ অমেরুদন্ডী প্রাণী, কাঁকড়া, ব্যাঙ ইত্যাদিও দলবেঁধে শিকার করে থাকে।কিছু ভোঁদড় শেলফিশ খুলতে দক্ষ, আর অন্যরা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী বা পাখি শিকার করে। নির্দিষ্ট শিকারের উপরে নির্ভরশীল বলে ভোঁদড় শিকারশূণ্যতার ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যান্য ভোঁদড়ের যেমন প্রথম পছন্দ মাছ। নোখহীন ভোঁদড়ের সবচেয়ে পছন্দের শিকার চিংড়ি,কাঁকড়া,ঝিনুক,শামুক সহ শক্তখোলসের প্রাণী।
ভোঁদড় সমাজবদ্ধ জীব। এরা বেশ ক্রীড়াপ্রবণও। বুদ্ধিমান এই প্রাণীগুলো বেশ বন্ধুবৎসল এবং সহজেই পোষ মানে। অনেক স্থানে, বিশেষত বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ও সুন্দরবন এলাকায় পোষা ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করতেও দেখা যায় মৎস্যজীবিদের।বেশিরভাগ ভোঁদড় জলাশয়ের কিনারে গর্তে বাস করে। শিকার করা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছাড়া এরা জলে নামে না, ডাঙাতেই বেশিরভাগ সময় কাটায়। তবে সামুদ্রিক ভোঁদড়রা জীবনের বেশিরভাগ সময় সমুদ্রে অতিবাহিত করে।
ভোঁদড়, জোয়ারপ্রবণ এলাকায় বাসা তৈরি করে জোয়ার-সীমানার উঁচুতে কোনো বড় গাছের তলায় গর্ত করে। গর্তের বেশ কয়েকটি মুখ থাকে। গর্তে ঢুকতে হয় জলের তলা দিয়ে। কিন্তু বাচ্চা প্রসবের জায়গাটি থাকে শুকনো এলাকায়। মায়ের সঙ্গে দুই-তিনটির বেশি বাচ্চা দেখা যায় না। সামুদ্রিক ভোঁদড় ছাড়া অন্য কোনো ভোঁদড় নোখহীন ভোঁদড়ের মতো লবণ সহ্য করতে পারে না। নোখহীন ভোঁদড়ের শত্রু হলো বাঘ,কুমির,হাঙর,মেছোবিড়াল,এবং অবশ্যই মানুষ। সাতটি বর্গে প্রায় তেরোটি প্রজাতির ভোঁদড় অষ্ট্রেলিয়া ছাড়া মোটামুটি গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।সুন্দরবন এলাকায় ভোঁদড়কে "ধাইরা" এবং "বাদার ধাইরা" (নখহীন ভোঁদড়) নামে ডাকা হয়। যেগুলোর ওজন হয় ৭ থেকে ৯ কেজি।