আদালতের রায়ে গুরুত্ব বাড়লো নির্বাচকদের, তবু ভোট নিয়ে ধন্দ
প্রায় ৭৫ বছর ধরে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলা স্বাধীন ভারতের নির্বাচনের যাত্রাপথে একদিকে যেমন গণতন্ত্রকে কলুষিত করার প্রচেষ্টা জারি থেকেছে অন্যদিকে তাকে বাঁচাবার প্রক্রিয়াও উদ্ভাবিত হয়েছে নির্বাচন কমিশন নামক উর্বর মস্তিস্ক থেকে। ক্ষমতার লোভ যেমন জন্ম দিয়েছে রিগিং, ছাপ্পা ভোট, সন্ত্রাস তেমনি এদের সঙ্গে লড়াই করতে এসেছে সচিত্র পরিচয় পত্র, ইভিএম, ভিভিপ্যাট, সিসি ক্যামেরা, ভিডিওগ্রাফি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা। এমনকি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাউকে পছন্দ না করার অধিকার, 'নোটা'। বলতে দ্বিধা নেই যে এত কিছু করার পরেও কিন্তু বহু মানুষ এখনও ভোট সম্পর্কে উদাসীন। বহু মানুষ এখনও ভোটাধিকার প্রয়োগের মত সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকে। যারা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয় তারাও মনে মনে ভোট সম্পর্কে একটা চরম অশ্রদ্ধা পোষণ করে কারণ, তাদের বন্ধ ধারণা ভোটের মাধ্যমে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন সে মানুষের একশো শতাংশ বন্ধু হতে পারবে না। বরং নির্বচিত হবার পর মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে না। আবার এই কারণেই তালিকায় যাদের নাম ওঠেনি তারাও তা নিয়ে তেমন সিরিয়াস নয়। অর্থাৎ ভোট মানুষের মনে একটা নেতিবাচক বিষয় হিসাবেই স্থান করে নিয়েছে।
অথচ এবারের এসআইআর কোনো এক অজানা জাদুতে এই নেগেটিভ আবহটাকে একেবারে পজিটিভে পরিণত করে দিয়েছে। এনুমারেশন ফর্ম পূরণে উন্মাদনা, নথি সংগ্রহের মরিয়া চেষ্টা, ছবি তুলতে দীর্ঘ লাইন ও শুনানীতে উপস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছে ভোটার হিসাবে স্বীকৃতি কতটা জরুরী। আর এই স্বীকৃতিকে মান্যতা দিয়ে ভারতের বিচার ব্যবস্থা সম্প্রতি যে দুটি রায় দিয়েছে তা নজিরবিহীন। ভোটার যাচাই করতে বিচারকদের অংশগ্রহণ এবং আপিলের সুযোগ দিতে ভোটার ট্রাইবুনাল গঠন নিঃসন্দেহে ভারতের বিচার ব্যবস্থায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ভারতের বিচার ব্যবস্থা বুঝিয়ে দিয়েছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সরকারি প্রশাসন ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র রক্ষা করতে তারা সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামতে সামান্য কুণ্ঠা বোধ করবে না।
এতো হল সময়ের দর্পনে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা। যদিও সুপ্রীম কোর্টের নজিরবিহীন রায়ের পরেও থেকে গেছে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। কলকাতা হাইকোর্টের রিপোর্ট অনুযায়ী ১০/১২ দিনে যে ১৫ লক্ষ ভোটারের বিচার সম্পূর্ণ হয়েছে তার ৪০ শতাংশ বাতিল বলে গণ্য হতে চলেছে। এই হিসাবকে যদি গড় বলে ধরা যায় তাহলে ৬০ লক্ষ মোট বিচারাধীনের ২৪ লক্ষ নাম বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। অর্থাৎ এই ২৪ লক্ষ ভোটার এনুমারেশন ফর্ম জমা দিয়ে দেশে তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করলেও ভোটাধিকার প্রয়োগের যোগ্য নয় বলে বিবেচিত হতে চলেছে। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আবেদনকারী নিশ্চয়ই ট্রাইবুনালে আপিল করবেন। এক্ষেত্রে ট্রাইবুনালের রায় বেরোতে যদি দেরি হয় তাহলে এই আপিলকারীদের যোগ্যতাও ভোটের আগে ঝুলে থাকবে। তাহলে যতদিন না রায় বেরোচ্ছে ততদিন এই আপিলকারীরা কি অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাবেন? নাকি পেলেও ট্রাইবুনালের রায়ে অযোগ্য হলে তাকে সব সুবিধা ফেরত দিতে হবে? ট্রাইবুনালের বিচারের আগে যদি ভোট ঘোষণা হয়ে যায় এবং তার পরে যারা ট্রাইবুনালে যোগ্য বলে বিবেচিত হবে তারা কি তাকে বাদ দিয়ে ভোট না করার আবেদন জানাতে পারবে? আর যারা ট্রাইবুনালে অযোগ্য বলে গণ্য হবে বা ট্রাইবুনালে যেতে ব্যর্থ হবে তারা কি অযোগ্য হয়েও আমাদের সঙ্গে বসবাস করবে? নাকি এদের চিহ্নিত করে দেশ থেকে বার করে দেওয়া হবে? আবার এমন প্রশ্নও সামনে আসছে যে ইতিমধ্যে চূড়ান্ত তালিকায় যাদের নাম উঠেছে তাদের নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তারাও কি ট্রাইবুনালে যেতে পারে? এসব প্রশ্নের কোনো মডেল উত্তর নেই। এর আগে বিচার বিভাগীয় অধিকারিকদের যোগ্য অযোগ্য ভোটার বাছতে হয়নি বা ভোটারদের জন্য ছিল না কোনো ট্রাইবুনাল।
ফলে এক্ষেত্রে রেফারেন্স জাজমেন্টের কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে যে ভোটারদের এতদিন একটা ভোট দেওয়া ছাড়া তেমন গুরুত্ব ছিল না বা যাদের নাম স্থানীয় বিএলও, সুপারভাইজার, এইআরও, ইআরওদের ইচ্ছায় বাদ দেওয়া বা তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ উঠতো তাদেরই এখন আইনের আওতায় গুরুত্ব বেড়ে গেল অনেকটা। এখন একজন ভোটার আইনের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একজন পোড় খাওয়া নাগরিক যে কারোর দয়াদাক্ষিণ্যে নয় নিজের আইনি অধিকারে নির্বাচক হিসাবে স্বীকৃত।
নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা, বিচার বিভাগের সক্রিয়তা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে ভোটপর্ব যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হবে কি না সেই সন্দেহ দানা বাঁধছে। যদিও বিভিন্ন সূত্র বলছে কয়েকদিনের মধ্যে এ রাজ্যের ভোট ঘোষণা হতে পারে। কিন্তু তার আগে কি যোগ্য-অযোগ্য ভোটার বেছে দিতে পারবেন বিচারকেরা? বিচারের অগ্রগতি সে কথা না বললেও যদি সুষ্ঠ নির্বাচনের স্বার্থে নিষ্পত্তি সম্পূর্ণ হওয়ার যুক্তি মেনে নেওয়া হয় তা বলেও গেরো হতে উঠতে পারে ট্রাইবুনালের আপিল। সব মিলিয়ে আগামী ভোট পশ্চিমবঙ্গে জটিল থেকে জটিলতর হতে চলেছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারনা। তবু বলতে হবে নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে রাজ্য পেতে চলেছে এক পরীক্ষালব্ধ ভোটার তালিকা যেখানে থাকবে না কোনো ভোটারকে নিয়ে সন্দেহ।
admin