তামিলনাড়ুতে কর্মস্থলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: ইট কাটা মেশিনে প্রাণ হারালেন গঙ্গাসাগরের শক্তিপদ দাস

তামিলনাড়ুতে কর্মস্থলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: ইট কাটা মেশিনে প্রাণ হারালেন গঙ্গাসাগরের শক্তিপদ দাস

সৌরভ নস্কর গঙ্গাসাগর: পেটের টান বড় বালাই। সেই টানেই ভিটেমাটি হারানো মানুষটি পাড়ি দিয়েছিলেন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে। আশা ছিল, হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে আবারও গুছিয়ে নেবেন নদী ভাঙনে তছনছ হয়ে যাওয়া সংসার। কিন্তু তামিলনাড়ুর এক ইটভাটার ঘড়ঘড়ানি শব্দ নিমেষেই স্তব্ধ করে দিল সেই সব স্বপ্ন। ইট কাটার মেশিনে কাটা পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হলো গঙ্গাসাগরের বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিক শক্তিপদ দাসের (৪৫)।মৃত শক্তিপদ দাস সাগর থানার কমলপুর ২ নম্বর কলোনির বাসিন্দা ছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তামিলনাড়ুর একটি ইটভাটায় কাজ করার সময় আচমকাই ঘটে এই বিপত্তি। মেশিনে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তাঁর দেহটি যন্ত্রের ভেতরে ঢুকে যায়। সহকর্মীরা ছুটে এসে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ততক্ষণে সব শেষ। যন্ত্রের ঘর্ষণে দেহটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। বর্তমানে তাঁর নিথর দেহটি তামিলনাড়ুর একটি হাসপাতালে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
শক্তিপদ বাবুর জীবন ছিল লড়াইয়ের অন্য নাম। আদতে তিনি ঘোড়ামারা দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন। কিন্তু রাক্ষুসে নদী গিলে খেয়েছে তাঁদের ঘরবাড়ি। ভিটেমাটি হারিয়ে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন সাগরের কমলপুর কলোনিতে। নতুন করে সংসার সাজানোর তাগিদেই বাধ্য হয়ে ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই অকালমৃত্যু তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিল। শক্তিপদ দাসের এই মৃত্যু বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে ফের একবার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র বাক্যবাণ। বিজেপি নেতা অরুণাভ দাস রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে সরাসরি তোপ দেগে বলেন, "বাংলায় কর্মসংস্থানের লেশমাত্র নেই। রাজ্য সরকার একের পর এক মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা 'ঢপ' দিচ্ছে। কাজের সুযোগ নেই বলেই মানুষ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে যাচ্ছে। শক্তিপদ দাসের এই মৃত্যু প্রমাণ করে দিল বাংলার বেকারদের করুণ অবস্থা।"সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে জানান, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবসময় পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে সজাগ। তাঁর অভিযোগ, "যেসব রাজ্যে বিজেপির 'ডবল ইঞ্জিন' সরকার চলছে, সেখানেই বাঙালি শ্রমিকদের হেনস্থা ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।" তিনি আরও জানান, কেন্দ্রকে বারংবার আবেদন করা সত্ত্বেও পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষায় কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা বলেন, "খবর পাওয়ামাত্রই আমি নবান্নে যোগাযোগ করেছি। মুখ্যমন্ত্রী মৃত শ্রমিকের পরিবারের প্রতি অত্যন্ত সমব্যথী। ইতিমধ্যেই তাঁর স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এক লক্ষ টাকা সরকারি সাহায্য পাঠানো হয়েছে।" শক্তিপদ দাসের ছেলে, যিনি নিজেও ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করেন, তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী যোগাযোগ রাখছেন। দেহটি যাতে দ্রুত সৎকার করা যায়, তার জন্য প্রশাসনের তরফে সবরকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একদিকে স্বজন হারানোর হাহাকার, আর অন্যদিকে কর্মসংস্থান নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি— শক্তিপদ দাসের মৃত্যু যেন বাংলার হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের অনিশ্চিত জীবনের এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল।