দেবর্ষি মজুমদার, বীরভূম: শিশিরের ঘোমটা দেওয়া পৌষমাসের শেষ দিন। পিঠে পুলি হবে না? তা কি আর হয়! আমাদের পেটে পিঠে পুলি ঢের সয়! এই সময় পিঠে পুলির রসে বশে থাকে দুই পাড়ের বাঙালি। সত্যি বলতে কি, অনেকেই ছোটো বেলায় চুরি করে পিঠে, পালো খেয়ে, পেটে ও পিঠে দুটোতেই সয়েছে!
এই পৌষ পার্বণ আপামর বাঙালির ঐতিহ্য। যা চিরায়ত হয়ে আজও বাঙালির জীবনে টিকে আছে। অবশ্য কতদিন থাকবে, তা বলা কঠিন। আধুনিকতার ছোঁয়াচ এই লোকায়ত প্রথাকে বিসর্জন দেবে কিনা জানা নেই।
তবে প্রাচীন হিন্দুরা পৌষ মাসের এই শেষ দিনটিতে পিতৃপুরুষ অথবা বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে তিল বা খেজুড় গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া কিম্বা নতুন ধানের চাল থেকে তৈরি পিঠের অর্ঘ্য উৎসর্গ করতেন বা সাজিয়ে দিতেন। এই কারণে পৌষ সংক্রান্তির অপর নাম তিলুয়া সংক্রান্তি বা পিঠে সংক্রান্তি। আহা! এই পৌষ পার্বণ নিয়ে বাঙালির কত না আবেগ!--
"চান্দের আলো লাগে ভালো চাঁদনী পসর রাইতে,
বিহান বেলা লাগে ভালো পিঠাপুলি খাইতে!"
পিঠে কি আর এক ধরণের? প্রস্তুতের নানান ধরন ও তারতম্যের কারণে উদ্ভব হয়েছে পুলিপিঠে, দুধপুলি, ভাজাপুলি, ভাপাপিঠে, চিতৈপিঠে, ক্ষীরপুলি প্রভৃতি। ভাজা পুলির মধ্যে মুগ পুলির স্বোয়াদ খুব ভালো। এছাড়াও ক্ষীরের গোকুল পিঠে, আহা! ভোলার নয়। পিঠেতে রসনা তৃপ্তির জাদু হয়তো তাকে বাংলার অন্য সব মিষ্টির থেকে পৃথক করেছে। পিঠের সাত কাহন বেশ মজার। সারা পৌষ মাস জুড়ে হয়ে থাকে। অনেক বাড়িতে, পিঠে দিয়েই রাতের খাবার। হরেক কিসিমের এই পিঠের কথা বলে শেষ করা যাবে না।
পাটিসাপটা: দুই পাড় বাংলার প্রিয়। চালেরগুঁড়ো ও ময়দার পাতলা প্যানকেকের মধ্যে ক্ষীর বা নারকেলের পুর। বাঙালদের তৈরি এই পিঠে দেখতে হয় দুধ সাদা। তবে খেঁজুর গুড়ের তৈরি হলে লালচে হয়। পুরের মাহাত্ম্য আর হাতের গুণে তা হয় মহত্তম।
দুধপুলি: চালের গুঁড়োর পুরভর্তি পুলি পিঠে দুধে ভিজিয়ে তৈরি করা হয়। এই পিঠে ঘটিরা অর্থাৎ এপাড় বাংলার মহিলারা বানাতে সিদ্ধহস্ত। তবে পূর্ব বঙ্গীয়রা খোয়ার রসে অন্য মাধুর্য আনে।
ভাপা পিঠা: চালের গুঁড়ো ও নারকেলের পুর ভাপে সিদ্ধ করা হয়। এই পিঠের দুই বাংলায় চল আছে। গরম গরম ভাপা পিঠে গুড়ের রসে চুবিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে।
সরুচুকলী ও পালো: এই দুটোই এই বাংলায় বহুল প্রচলিত। চালের গুড়ি দিয়ে উনুনের তাওয়ায় তালপাতা দিয়ে টেনে টেনে বানানো হয়। আঁশকে ফোঁড়ের ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ শুনেই বোঝা যায় কোন বাড়িতে ফোঁড়ের সরুচুকলি হচ্ছে।
খেঁজুরগুড়, বাঁধাকপির তরকারি দিয়ে এই পিঠে বেশ আহামরি খাবার। পালোর কথা বলা বাহুল্য। পাত্রে সরষের তেলের ব্রাশ করে তারপর এই সুমিষ্ট চালের গুড়োর মিশ্রণ ঢেলে রাখা হয়। সারা রাতা এইভাবে থাকার পর, সকালে চাপ বেঁধে যায়। এই ঠান্ডা পালো সকালে কেটে কেটে পাতে দেওয়া হয়। শুকনো মুড়ি পালো দিয়ে মাখিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে।
গোলাপ পিঠা: এই পিঠের জন্ম কুণ্ডলী জানা না থাকলেও, এই পিঠে মূলত পূর্ব বঙ্গীয় বলে শোনা যায়।
ফুল আকৃতির ভাজা পিঠা, যা দেখতে সুন্দর ও খেতে সুস্বাদু। এছাড়াও রয়েছে চিতই পিঠা, পাক্কান পিঠে, ম্যারা পিঠে ও বিন্নি পুলি। এই পিঠেগুলো মূলত পূর্ব বঙ্গীয়। স্থান মাহাত্ম্যে তা শুধু অনন্য স্বাদে ভুরিভোজই নয়, লোকমুখে মেলে তার ভুড়িভুড়ি প্রমাণ--"চিতই পিঠা" হয় না মিঠে, খাই ডুবিয়ে রসে/ হুড়মুড়ে খাই "পাক্কান পিঠা" মায়ের কাছে বসে।
নোয়াখালীর "ম্যারা পিঠা", 'নারিকেলের চিড়া'। চট্টগ্রামের "বিন্নি পুলি" না খেলে দেয় পীড়া।