পৌরসভা থেকে পঞ্চায়েত,ব্রিটিশ আমলের ক্যানিং কলঙ্কময়
সুভাষ চন্দ্র দাশ, ক্যানিং -ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী ক্যানিং শহর।মাতলা নদীর তীরে ক্যানিং শহর অবস্থিত। যা আজও অজস্র ইতিহাসের স্মৃতির সাক্ষী বহন করে চলেছে।একটা সময় এই ক্যানিং শহর ছিল তৎকালীন ব্রিটিশদের ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম পীঠস্থান। ক্যানিংয়ের মাতাল মাতলা নদীকে ব্যবহার করে ব্যবসায়ীক উপাদান আমদানি ও রপ্তানি করা হতো।আর এই ক্যানিং বন্দরে একসাথে প্রায় ১৪-১৫ টি জাহাজ এখানে নোঙ্গর করতো।
এই ক্যানিং শহর কে বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলেন তৎকালীন ব্রিটিশ আমলের প্রথম বড়লাট ডালহৌসি সাহেব।মূলত তাঁর উদ্যোগে ও একান্ত প্রচেষ্টায় বৃহত্তম ব-দ্বীপ গহীণ অরণ্য সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে প্রথম তৈরী হয় পোর্ট ক্যানিং। তখন অবশ্য গঙ্গার নদীর নাব্যতা ক্রমশঃ হ্রাস হওয়ায় পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথ অসুবিধা হয়।আর এই কারণে দক্ষিণের বৃহত্তম গভীর মাতলা নদীকেই বাণিজ্যপথ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল।
১৮৫৩ সালে প্রথম শুরু হয় মাতলা নদীর তীরে মাতলা গ্রামকে বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার কাজ। প্রচুর কর্মী ও শিকারী আসেন। নদীর পশ্চিমে প্রায় ৮ কিলোমিটার নদী বাঁধ দিয়ে ঘেরা হয়।অতীতে এখানে একটা সময় প্রচুর বাঘের আনাগোনা ছিল।আর প্রতি বাঘ পিছু শিকারীদের পারিশ্রমিক ছিল পাঁচ টাকা। ১৮৫৬ সালে এই কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয়। তৈরি হয় নতুন জেটি ঘাট, নদীবাঁধ, খাল, বাজারহাট। তখন বড় লাট হয়ে আসেন লর্ড ক্যানিং সাহেব। তিনিই ১৮৫৮ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই পোর্ট ক্যানিংয়ের সূচনা করেন।
১৮৬২ সালে ক্যানিং (পূর্ব নাম -পোর্ট ক্যানিং) পৌরসভা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। নাম হয় ক্যানিং মিউনিসিপালিটি। আর এই একমাত্র ক্যানিং পৌরসভা নিয়ে একটি কথা বলে রাখা ভালো “এক মাত্র ক্যানিং শহর যা দেশ তথা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল থেকে বিরলতম ঘটনা পৌরসভার স্বীকৃতি অবলুপ্তি হয়ে আজ পঞ্চায়েতে শাসনে বিরাজমান।যা দেশ তথা পৃথিবীর কোনপ্রান্তে এমন ঘটনা কোথাও ঘটেনি।”
১৮৬৩ সালে ক্যানিং পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারিত হয় এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে রেল চালু হয়।একই বছরে ক্যানিংয়ে প্রথম জাহাজ প্রবেশ করে কথা ছিল। কিন্তু ক্যানিং নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে আরো সাত মাইল পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হবে। কিন্তু ততকালীন প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিংয়ের প্রবল অনিচ্ছা ও উদাসীনতায় তা আর সম্ভবপর হয়নি। ১৬০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আজও সেই স্বপ্ন অধরা রয়েই গেছে।
ছোট লাট ও ভারতের প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিংয়ের নাম অনুসারে নাম হয় ক্যানিং। তৎকালীন মাতলা নদীর তীরে বানিজ্যের আমদানি রপ্তানি হিসাবের সুবিধার্থে একটি দ্বিতল কক্ষ নির্মাণ করা হয়, যা অধুনা ক্যানিং সাহেবের বাংলো হিসাবে পরিচিত। তা বর্তমানে পরিত্যক্ত হিসাবে রয়েছে (ক্যানিং গোলকুঠি পাড়া)।ক্যানিং সাহেব এখানে ছিলেন কিনা সে বিষয়ে প্রচুর বিতর্কও রয়েছে। তবে লেডি ক্যানিং এখানে এসেছিলেন। নদী পরিবেষ্টিত নোনা আবহাওয়া ও গ্রাম্য প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে উনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। মুগ্ধ হয়ে তিনি বেশ কিছু তৈল চিত্র অঙ্কন করেছিলেন। ওনাকে খুশী করার জন্য তখন স্থানীয়রা দুধ চিনি ময়দা সহযোগে ওনাকে একপ্রকার মিষ্টি তৈরী করে খাইয়ে ছিলেন যা খেয়ে তিনি অত্যন্ত প্রীত হোন।মূলতঃ ওনার নাম থেকেই সেই মিষ্টির নাম হয় লেডি ক্যানিং। যা পরবর্তীতে অপভ্ৰংশ হয়ে ‘লেডিকেনি’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।সেদিক দিয়েও ক্যানিংবাসীর গর্ব।সুস্বাদু মিষ্টি লেডিকেনি বাংলার আবিষ্কার।
এছাড়াও জানা যায় তৎকালীন এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক ঝড়ে একসাথে প্রায় ১২ টি জাহাজ ক্ষতবিক্ষত হয়ে ভেঙে যায়। তারপর থেকেই ধীরে ধীরে এই মাতলা গঞ্জ(ক্যানিং)তার ব্রিটিশদের বাণিজ্যনগরী হিসাবে গুরুত্ব হারাতে থাকে।পরে মাতলা নদীর নাব্যতা ক্ৰমশঃ কমে যাওয়ায় এই পোর্ট ক্যানিং ধীরে ধীরে একপ্রকার বন্ধই হয়ে যায়।এক সময়ের বিখ্যাত ক্যানিং শহর বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়ে উন্নত হলেও পুরানো পৌরসভার স্বীকৃতি হারিয়ে আজও সেই কলঙ্কের কালিমায় কলঙ্কিত।চলছে পঞ্চায়েতি শাসন ব্যবস্থা।তবে ক্যানিং সেই ক্যানিংয়েই রয়ে গিয়েছে সুন্দরবনের অন্যতম প্রবেশদ্বার কিংবা সিংহদূয়ার নামে।আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়ে উন্নত হয়েছে ঠিকই তবে ক্যানিং হারিয়েছে তার পৌরসভা স্বীকৃতি।
admin