ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণতন্ত্রীকরণ, সারা দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিকাঠামো, দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রসার

ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণতন্ত্রীকরণ, সারা দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিকাঠামো, দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রসার

নতুন দিল্লি, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মূল বক্তব্য
- বলা যায়, ৩৮ হাজারের বেশি গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট ঘণ্টায় মাত্র ৬৫ টাকায় উপলব্ধ, ফলে, সাশ্রয়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ বেড়েছে।
- দেশের ৯৯.৯ শতাংশ জেলায় পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল পরিষেবা পৌঁছেছে, ফলে, বড় মাপের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।
- জাতীয় তথ্যভাণ্ডার প্ল্যাটফর্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোষে ৭ হাজার ৫০০টির বেশি তথ্যভাণ্ডার এবং ২৭৩টি মডেল উন্মুক্ত জাতীয় সম্পদ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভূমিকা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভারতের উন্নয়ন অভিযাত্রার কেন্দ্রে পৌঁছেছে। প্রশাসনিক কার্যক্রম শক্তিশালী হচ্ছে। জনপরিষেবা আরও কার্যকর হচ্ছে। নাগরিকদের কাছে বৃহৎ পরিসরে সমাধান পৌঁছোচ্ছে।
মানবসভ্যতার অগ্রগতি বরাবরই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যুৎ দৈনন্দিন জীবন বদলেছে। কম্পিউটার তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ধরন পাল্টেছে। ইন্টারনেট মানুষ ও ব্যবস্থাকে যুক্ত করেছে। মোবাইল ফোন প্রযুক্তিকে নাগরিকের হাতের মুঠোয় এনেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উৎপাদন, জলবায়ু পদক্ষেপ ও প্রশাসনে রূপান্তর ঘটাচ্ছে।
ভারতের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণতন্ত্রীকরণ অপরিহার্য। এতে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে। ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারতের লক্ষ্যের সঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গণতন্ত্রীকরণের জন্য প্রয়োজন সমানভাবে কম্পিউটিং শক্তি, তথ্যভাণ্ডার ও মডেল ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার। এগুলি নির্ধারণ করে কে উদ্ভাবন করবে, কে প্রতিযোগিতায় এগোবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে কে নেতৃত্ব দেবে। ভারতের উন্নয়নমুখী নীতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্রে গণতন্ত্রীকরণ রেখেছে। স্টার্টআপ, গবেষক, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবকেরা এতে অংশ নিতে পারছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-এর ১৬ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নতুন দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ভারত-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রভাব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। গ্লোবাল সাউথে প্রথম এমন আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে। রাষ্ট্রনেতা, নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞেরা অংশ নেবেন। আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, সুশাসন ও সুস্থায়ী উন্নয়ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণতন্ত্রীকরণ-বিষয়টি কি?
গণতন্ত্রীকরণ মানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবার জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও ব্যবহারযোগ্য করা। শুধু অ্যাপ নয়, মূল পরিকাঠামোতে প্রবেশাধিকার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটিং শক্তি, তথ্যভাণ্ডার ও মডেল ব্যবস্থা।
এটি অর্থনৈতিক সুযোগ বিস্তারের পথও খুলে দেয়। বর্তমানে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে ৬০ লাখের বেশি মানুষ কর্মরত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে নীতি আয়োগের প্রতিবেদন দেখিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ৪৯ কোটি অসংগঠিত শ্রমিককে নতুন সুযোগ দেবে। পরিষেবা, বাজার ও আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ সহজ হবে।
ভারতের ডিজিটাল দর্শনের ধারাবাহিকতায় ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেস ডিজিটাল লেনদেন উন্মুক্ত করেছে। আধার জনসংখ্যার স্তরে ডিজিটাল পরিচয় গড়েছে। দেশীয় চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা বাড়িয়েছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও একই পথে এগোচ্ছে।
জনকল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর পরই কার্যকর। ভারতে বাস্তব প্রয়োগের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
কৃষিতে আবহাওয়া পূর্বাভাস, কীট ঝুঁকি নির্ধারণ ও সেচ পরিকল্পনায় সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। কৃষক ই-মিত্র প্ল্যাটফর্ম সরকারি প্রকল্পে প্রবেশ সহজ করেছে। জাতীয় কীট নজরদারি ব্যবস্থা ও শস্য স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ তথ্য ব্যবহার করছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে সহায়তা, চিকিৎসা চিত্র বিশ্লেষণ ও টেলিমেডিসিন প্রসার ঘটছে। গ্রামীণ রোগীরা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। বৃষ্টি, কুয়াশা ও ঝড়ের পূর্বাভাস উন্নত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় নিরীক্ষণে উন্নত পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতে ২ লাখের বেশি স্টার্টআপ রয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিকাঠামোতে প্রবেশাধিকার
২০২৪ সালের মার্চে পাঁচ বছরের জন্য ১০ হাজার ৩৭১ কোটি ৯২ লাখ টাকার ভারত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মিশন অনুমোদিত হয়েছে। লক্ষ্য তিনটি। প্রবেশাধিকার বাড়ানো, তথ্যভাণ্ডার শক্তিশালী করা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা।
তথ্যভাণ্ডার ও মডেল
জাতীয় প্ল্যাটফর্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোষ সরকারি ও বেসরকারি তথ্য একত্র করেছে। উদ্ভাবকেরা নতুন করে সবকিছু বানানোর বদলে প্রস্তুত তথ্য ব্যবহার করতে পারছেন।
দেশীয় বহুভাষিক বড় মডেল তৈরির কাজকর্মও চলছে। এতে স্থানীয় ভাষা ও প্রেক্ষাপট গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথম দুই ধাপে ১২টি স্টার্টআপ নির্বাচিত হয়েছে।
কম্পিউটিং শক্তি
প্রসঙ্গত, ৩৮ হাজারের বেশি উচ্চক্ষমতার গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট ঘণ্টায় ৬৫ টাকায় উপলব্ধ। এটি আন্তর্জাতিক গড়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। পাশাপাশি, ১ হাজার ৫০টি টেনসর প্রসেসিং ইউনিট যুক্ত হয়েছে।
জাতীয় সুপারকম্পিউটিং মিশনের মাধ্যমে ৪০ পেটাফ্লপের বেশি ক্ষমতা স্থাপন করা হয়েছে। ভাষা প্রক্রিয়াকরণ, আবহাওয়া পূর্বাভাস ও ওষুধ গবেষণায় এগুলি কাজে লাগছে।
চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর
বস্তুত, ৭৬ হাজার কোটি টাকার ভারত সেমিকন্ডাক্টর মিশন দেশীয় উৎপাদন ও নকশা শক্তিশালী করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়টি রাজ্যে ১০টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। মোট বিনিয়োগ ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।
২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের চিপ বাজার ১০০ থেকে ১১০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। ২০২৬-২৭ বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০ শুরু হয়েছে। এতে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। গবেষণা ও প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হবে।
ডেটা সেন্টার ও সংযোগ
প্রসঙ্গত, ৯৯.৯ শতাংশ জেলায় পঞ্চম প্রজন্মের পরিষেবা পৌঁছেছে। পাঁচ লাখ আট হাজার বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন স্থাপিত হয়েছে।
দেশে বর্তমানে ১ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট ডেটা সেন্টার ক্ষমতা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়বে। মুম্বই-নবি মুম্বই সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদ গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা মোট ক্ষমতার ৩ শতাংশ জোগায়।
শক্তি ও সুস্থায়ী ব্যবস্থা
২০২৫ সালের জুনে ভারতের বিদ্যুৎ ক্ষমতার ৫০ শতাংশ অ-জীবাশ্ম উৎস থেকে এসেছে। ২০২৫-এর নভেম্বরে নবায়নযোগ্য ক্ষমতা দাঁড়ায় ২৫৩.৯৬ গিগাওয়াট।
পারমাণবিক শক্তিও বাড়ছে। ২০৩১-৩২ সালের মধ্যে ক্ষমতা ২২.৩৮ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে।
নীতি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো
সরকারি ক্লাউড মেঘরাজ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিষেবা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ১৭০টি মন্ত্রক ও বিভাগ এতে যুক্ত হয়েছে।
২০১৭ সালের ওপেন ডেটা লাইসেন্স উদ্ভাবন সহজ করেছে। ২০২৩ সালের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষা করছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা বিকাশ
স্বাস্থ্য, কৃষি ও সুস্থায়ী নগর উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও নতুন কেন্দ্র শুরু হয়েছে।
স্কুল পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুতি কর্মসূচি চলছে। কারিগরি প্রশিক্ষণে ৩১টি নতুন কোর্স যুক্ত হয়েছে।
জাতীয় ই-পরিচালন বিভাগ যুবাই কর্মসূচি চালাচ্ছে। এতে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা যুক্ত।
ভারত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মিশনের অধীনে ৫০০ পিএইচডি, ৫ হাজার স্নাতকোত্তর ও ৮ হাজার স্নাতক শিক্ষার্থী সহায়তা পাচ্ছে। মোট ৩১টি তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষাগার স্থাপিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
ভারত-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রভাব সম্মেলনে ১৫ থেকে ২০ জন রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নেবেন। বস্তুত, ৫০ জনের বেশি মন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন।
গণতন্ত্রীকরণ কর্মীগোষ্ঠীর সহ-সভাপতিত্ব করছে ভারত, মিশর ও কেনিয়া। লক্ষ্য তিনটি। সম্পদ সহজলভ্য করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দক্ষতা বিনিময় জোরদার করা।
উপসংহার
ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি দেখিয়েছে স্কেল, অন্তর্ভুক্তি ও উদ্ভাবন একসঙ্গে এগোতে পারে। কৃষক, ছাত্র, গবেষক, স্টার্টআপ ও সরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই উপকৃত হচ্ছে।
গণতন্ত্রীকরণ এককালীন প্রকল্প নয়। এটি ধারাবাহিক অঙ্গীকার। লক্ষ্য একটাই। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সমাজকে শক্তিশালী করবে, বৈষম্য কমাবে এবং সুস্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।