মানুষ কিসে টাকা ব্যয় করে, কিসে কৃপণ হয়

মানুষ কিসে টাকা ব্যয় করে, কিসে কৃপণ হয়
নাজমিন মর্তুজা, গবেষক ও কবি, প্রবাসী বাংলাদেশী, অস্ট্রেলিয়া: বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাকালেই প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ হয়। এখানে অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যায়, গরিব ছাত্র পড়াশোনা ছাড়ে, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দু’মুঠো খাবারের জন্য হাহাকার করে। অথচ পাশে দাঁড়ানোর মানুষ কম। সাহায্যের কথা উঠলেই আমরা হিসাব করি, সন্দেহ করি, পেছনের গল্প খুঁজি। একশ টাকা দিতেও মনে হয়, কেউ বুঝি ঠকাচ্ছে।
কিন্তু একই সমাজে বিনোদনের নামে, নোংরা প্রদর্শনের নামে, অর্থহীন বাহুল্যের পেছনে কোটি কোটি টাকা উড়ে যায়। কোনো এক সেলিব্রিটির জন্মদিনে কেক, উপহার, আয়োজনের নামে লাখ নয় কোটি টাকা খরচ হয়। গিফটের নামে দেওয়া হয় দামি গাড়ি, ঘড়ি, বাড়ি। তখন আর প্রশ্ন ওঠে না এই টাকাটা কোথা থেকে এলো, কেন এলো, বা এতে কার কী উপকার হলো।
এই দ্বিচারিতার ছবিটা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ১৯৫৫ সালে ইতালির এক ঘটনায়। বিখ্যাত গায়িকা জুলিয়া মার্কিন শহরের এক মোড়ে দাঁড়িয়ে নিজের ব্রা খুলে বলেছিলেন, “এটা নিলাম করতে চাইছি বলুন, কত টাকা দেবেন?” মুহূর্তেই লোকজন মরিয়া হয়ে ওঠে। দাম উঠতে উঠতে পৌঁছায় ৩০০০ ডলারে। তখন তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলেছিলেন তোমরা জানো, এই ব্রা কিনে কোনো যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না, তবু এর পেছনে হাজার হাজার ডলার খরচ করতে রাজি। অথচ কোনো দরিদ্র, অভুক্ত মানুষ এক ডলার চাইলে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও।
এই কথাগুলো শুধু ইতালির জন্য নয়, আমাদের সমাজের জন্যও আয়নার মতো। ধর্মের কাজে সাহায্য চাইলে আমরা অভাবের কথা বলি, সামাজিক কাজে ডোনেশন চাইলে দেনার গল্প করি। কিন্তু নাচ-গান, শোডাউন, ভোগ আর প্রদর্শনের ডাক এলেই আমরা প্রথম সারিতে। তখন টাকার অভাব হয় না, তখন বিবেক ঘুমিয়ে পড়ে।
এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে কষ্টের আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি না কেন? কেন একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না আমাদের স্পর্শ করে না, অথচ গ্ল্যামার, শরীর, বাহুল্য আমাদের পকেট খুলে দেয়? এই মানসিকতা বদলানো ছাড়া কোনো সমাজই সত্যিকার অর্থে মানবিক হতে পারে না।