২০০০ টি সোলের বল দিয়ে কবিগুরুর প্রতিকৃতি! ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডে নাম তুলে কাকদ্বীপের অদৃতির তাক লাগাল সাফল্য

২০০০ টি সোলের বল দিয়ে কবিগুরুর প্রতিকৃতি! ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডে নাম তুলে কাকদ্বীপের অদৃতির তাক লাগাল সাফল্য

সৌরভ নস্কর, কাকদ্বীপ : ​মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে অনন্য এক শিল্পকলা প্রদর্শন করে ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এ নিজের নাম নামাঙ্কিত করলেন কাকদ্বীপের প্রতিভাবান কিশোরী অদৃতি মাইতি। কোনো সাধারণ রং বা তুলির সাহায্য না নিয়ে, সম্পূর্ণ থার্মোকল বা সোলের বলের নিখুঁত ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অপূর্ব ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি। ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি বাই ১ ফুট ৭ ইঞ্চি জায়গার উপর প্রায় দু'হাজার সোলের বলের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত শিল্পকর্মটি সম্প্রতি ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস কর্তৃপক্ষের নজর কেড়েছে।এরপর সমস্ত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁর বাড়িতে এসে পৌঁছায় কাঙ্ক্ষিত সার্টিফিকেট, মেডেল, ল্যাপেলপিন ব্যাজ, অফিশিয়াল আইডি কার্ড এবং ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডসের অফিশিয়াল রেকর্ড বুক।​বর্তমানে সুন্দরবন আদর্শ বিদ্যামন্দির স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী অদৃতির বাড়ি কাকদ্বীপের অক্ষয় নগর, বাসন্তী ময়দান এলাকায়। তাঁর এই সাফল্যের নেপথ্যের যাত্রাটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক ও কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোলেও হার না মানা জেদে ভরপুর। মাত্র নয় বছর বয়সে অদৃতির বাবা অকালপ্রয়াত হন। এরপর থেকে তাঁর মা রুম্পা মাইতি তাঁকে নিয়ে কাকদ্বীপের মামার বাড়িতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের প্রতিভাকে বিসর্জন দেননি অদৃতি। মামাবাড়িতে থেকে স্থানীয় প্রখ্যাত শিল্পশিক্ষক দেবরাজ বেরার কাছে ছবি আঁকা এবং এই ধরনের নানা অভিনব শিল্পচর্চা শুরু করেন তিনি। সোলের বল দিয়ে এমন জটিল ও নিখুঁত কাজ ফুটিয়ে তুলতে শিক্ষক দেবরাজ বাবুর দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং নিরলস নির্দেশিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ​পরিবারের বহুদিনের সংগ্রাম, মায়ের আত্মত্যাগ আর কঠোর পরিশ্রমের পর এমন একটি জাতীয় স্তরের স্বীকৃতি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা অদৃতি ও তার পুরো পরিবার। শিক্ষক দেবরাজ বাবুও তাঁর এই কৃতি ছাত্রীর অবিশ্বাস্য সাফল্যে অত্যন্ত গর্বিত। এই অভাবনীয় প্রাপ্তির পর থামতে নারাজ অদৃতি। সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আগামী দিনে শুধু দেশেই নয়, বিশ্বমঞ্চে বা ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম তোলার পাশাপাশি আরও কিছু নতুন এবং ব্যতিক্রমী শিল্পকলা দেশবাসীকে উপহার দিতে চায় এই কিশোরী। তার এই অভাবনীয় সাফল্যে গোটা কাকদ্বীপ অঞ্চল এবং সুন্দরবনজুড়ে এখন খুশির হাওয়া বইছে। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও তাঁকে সংবর্ধনা ও শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে। ​মা রুম্পা মাইতি মেয়ের এই সাফল্যে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "ছোটবেলা থেকেই ওর আঁকার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল এবং আঁকা নিয়েই ও আস্তে আস্তে এগোতে চাইছিল।কিন্তু খুব ছোটবেলায় ওর বাবা মারা যাওয়ার কারণে আমাদের পরিবারে বিরাট ধাক্কা আসে, যার ফলে সেই সময় আমরা থমকে গিয়েছিলাম। এরপর দেবরাজ স্যারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় এবং তিনি যেভাবে অদৃতিকে পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্পকলায় উৎসাহ ও সাপোর্ট যুগিয়েছেন, তা সত্যিই ভোলার নয়। স্যারের এই অবদান এবং মেয়ের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজ এই বড় সাফল্য এসেছে।" মেয়ের এমন অর্জনে তাঁর চোখে যেমন আনন্দের জল, তেমনই বুকভরা গর্ব।​অন্যদিকে, সুন্দরবন আর্ট একাডেমীর প্রধান শিক্ষক দেবরাজ বেড়া তাঁর ছাত্রীর এই বিশেষ কৃতিত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান, "ও একদিন আমাকে নিজে থেকেই এসে বলেছিল, স্যার আমি এমন কিছু একটা কাজ করতে চাই, যেখান থেকে অন্তত আমার এবং আমাদের এলাকার একটা নিজস্ব পরিচিতি তৈরি হতে পারে। ওর সেই অদম্য জেদ দেখেই আমি তাকে এই ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এর আইডিয়া দিই এবং কাজ শুরু করতে বলি। তারপর থেকেই ও একটানা এই কঠিন চেষ্টা চালিয়ে গেছে।" শিক্ষক হিসেবে তিনি আরও জানান, এত কম বয়সে এবং এত সহজে যে এই জাতীয় সাফল্য এমন বিশাল আকারে ধরা দেবে, তা তিনিও প্রথমে ভাবতে পারেননি। অদৃতির এই একাগ্রতাই আজ তাকে এই উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।