আমলা তান্ত্রিক
ওঙ্কার মিত্র: আজকে ভারতের প্রশাসনে আমরা যে প্রভৃভক্ত আমলাদের দেখা পাই তাদের উৎপত্তি মূলত ব্রিটিশ আমলে। এদের কাজ ছিল নেটিভ অর্থাৎ ভারতবাসীদের দমন করে ব্রিটিশ প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা করা। এটাই ছিল তন্ত্র এতটাই সফল যে, কিছু নাম-তখনকার আমলাতান্ত্রিকতা। এই ধাম এধার ওধার করে এই তন্ত্রের ছাঁচে গড়া আমলাদেরকেই প্রশাসনে স্থাপন করে গিয়েছেন স্বাধীন ভারতের ঠেকা নেওয়া তৎকালীন কর্ণধাররা। এই আমলাদেরকেই সংবিধানে এক্সিকিউটিভ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা গণতান্ত্রিক ভারতে লেজিসলেটিভ বা জনপ্রতিনিধির বেশ ধরা শাসকদের স্বার্থ রক্ষা করবে। অনেকে বলে, এরা অনেকটা তরল পদার্থের মত। ক্ষমতায় যে দল আসবে তাদের তৈরি পাত্রের আকার ধারণ করবে। আবার অনেকের মতে, এরা অনেকটা হাওয়া মোরগের মত। এদের দেখলে বোঝা যায় রাজনৈতিক হাওয়া কোন দিকে বইছে। ফলে এদের চরিত্র বুঝতে গিয়ে বার বার ঠকে গিয়েছেন রাজনীতিকরা। আজ যে সব আমলাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সবুজ দলের দলদাস কাল ক্ষমতা বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে তারা বনে যাবে লাল দলের দলদাস। আবার পরশু ক্ষমতা পাল্টালে হয়ে যাবে গেরুয়া দলের অনুগত। কথিত আছে এই বাংলায় দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার পতনের পর জ্যোতি বসু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমলারা যে কতটা ভয়ঙ্কর তা আমরা বুঝতে পারিনি। অথচ সেই আমলাদের নিয়েই বহাল তবিয়তে জ্যোতি বাবু প্রায় ২৫ বছর মুখ্যমন্ত্রীত্ব করে গিয়েছেন।
আসলে আমলা তান্ত্রিকদের একটা আলাদা মন্ত্র আছে যা সারা ভারতের সর্বত্র এক। সেই মন্ত্র হল, সংবিধানের দেওয়া ক্ষমতা বলে ক্ষমতাসীনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কেরিয়ার তৈরি করা। ব্রিটিশের শেখানো শাসনে এরা এতটাই পটু যে কাগজে কলমে জনগণের জন্য নিবেদিত হলেও বাস্তবে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও এরা মানুষের বন্ধু না হয়ে শাসক হিসাবেই পরিচিত। বাংলাও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানেও ডান ও বামপন্থী দুই আমলেই এই আমলা তান্ত্রিকরা বহাল তবিয়তে সঙ্গত করেছে। রাজ্য পিছিয়ে পড়লেও সব দায় রাজনীতিকদের উপরে চাপিয়ে নিজেদের আড়াল করতে এদের জুড়ি মেলা ভার। এদের এমনই সম্মোহনী শক্তি যে ক্ষমতায় থাকলে এদের প্রশংসা করা ছাড়া গতি নেই শাসক দলের। ক্ষমতা হারানোর আগে বোঝার উপায় নেই এইসব আমলা তান্ত্রিকদের কলকাঠির জোর। ঠিক এই মুহুর্তে বাংলায় আমলা তান্ত্রিকদের আচরণ দেখলে তা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। গত ৭৫ বছরের শাসনব্যবস্থা দেখে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যখন ধরেই নিয়েছে যে এ রাজ্যের আমলারা শাসক দলের কাছে বিকিয়ে গিয়েছে তখন নির্বাচন কমিশনের বিধি চালু হতেই আমলা তন্ত্রের প্রকৃত চেহারা সামনে চলে এসেছে। এতদিন যারা শাসক দলের একনিষ্ঠ ছিল তারাই এখন প্রিয় শাসকে ফেলে কমিশনের বাধ্য ছেলে হয়ে উঠেছে।
ভেবে দেখা দরকার বাংলার উচ্চপদস্থ আমলাদেরকে এবারে এভাবে নির্বাচন কমিশনের তোপের মুখে পড়তে হল কেন। কেন তাদের মনে হচ্ছে এবারের নির্বাচনের রাশ তাদের হাতে থাকবে না। সবটাই নিয়ন্ত্রণ করবেন পর্যবেক্ষকরা। এর প্রধান কারণ হল বিগত নির্বাচনগুলোতে তাদের ভূমিকা। চাহিদা মত সেন্ট্রাল ফোর্স দেওয়া সত্বেও তারা প্রতিবার রক্তপাতহীন নির্বাচন ও বিরোধীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। আটকাতে পারেননি ভোেট পরবর্তী হিংসা। পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তাদের হাতে থাকা সত্বেও তারা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাতে পারেননি। ভোট গ্রহণ থেকে গণনা কেন্দ্র সবেতেই তাদের নিরপেক্ষতাহীনতার ছাপ স্পষ্ট। এছাড়াও সারা বছর ধরে এরা যে ভাবে একটি দলের কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, তাতে তাদের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে যায়। দলীয় সংকীর্ণ রাজনীতির জন্য এরা প্রোটোকল ভাঙতেও দ্বিধা করে না। এমন উদাহরণ এদেরকে জাতীয় পর্যায়ে সন্দেহের মুখে ফেলে দিয়েছে। বাংলার শীর্ষ আমলাদের পক্ষপাতদুষ্ট কাজ চুঁইয়ে পড়েছে নিচুতলাতেও। ফলে আইএএস-আইপিএসদের সঙ্গে কোপ পড়ছে নিচুতলার অফিসারদের উপরেও।
ফলে পরিস্থিতি যখন চরমে ওঠে তখন একসময় ছিন্ন হয়ে যায় রাজনীতিক ও ব্যুরোেক্রাটদের সম্পর্ক। সন্দেহের পারদ বাড়তে থাকে দুপক্ষে। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। বাংলাতেও ঠিক এটাই দেখা যাচ্ছে ভোটের আবহে। যে শাসক এতদিন যাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল সেই শাসক তাদেরই এখন দাগিয়ে দিচ্ছে ড্রাগ, ক্যাশ, অস্ত্র-পাচারকারিদের মদতদাতা হিসেবে। নিজের প্রশাসনের অফিসাদের বিরুদ্ধেই জমা পড়ছে শাসকের আপত্তি। তবে এর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও সকলের দৃঢ় বিশ্বাস ভবিষ্যতে যেই আসুক এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ভারতের ব্রিটিশ বান্ধব এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণতান্ত্রিক আমলা আসলে সোনার পাথর বাটি হয়েই থেকে যাবে।
admin