ডাঃ মানস কুমার সিংহ: আধুনিক বিশ্বে সংক্রামক রোগ মানবসমাজের জন্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতার পর মানুষ আরও বেশি সচেতন হয়েছে নতুন ও উদীয়মান ভাইরাসজনিত রোগ সম্পর্কে। এই প্রেক্ষাপটে নিপা ভাইরাস একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও উদ্বেগজনক সংক্রামক রোগ হিসেবে পরিচিত। ভারতে একাধিকবার নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে।
নিপা ভাইরাস কীঃ
নিপা ভাইরাস (Nipah Virus) একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। প্রথম ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ফলখেকো বাদুড় (Fruit Bat) এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। কখনও কখনও শূকর বা অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এসেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
সংক্রমণের লক্ষণ ও ভয়াবহতাঃ
নিপা ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ সাধারণ জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, গলা ব্যথা দিয়ে শুরু হলেও দ্রুত এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis) দেখা যায়। এই রোগের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি—প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে নিপা ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নেই, ফলে চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক ও সহায়ক চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ভারতবর্ষে প্রথম নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা ধরা পড়ে ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি এলাকায়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে নদীয়া জেলাতেও নিপা সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কেরালা রাজ্য নিপা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ২০১৮ সাল থেকে একাধিকবার কেরালায় নিপা সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুও ঘটেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিঃ
বর্তমানে ভারতে নিপা ভাইরাস সংক্রমণ বড় আকারের মহামারিতে রূপ নেয়নি, তবে বিচ্ছিন্নভাবে সংক্রমণের ঘটনা মাঝেমধ্যে সামনে আসছে। স্বাস্থ্য দপ্তর ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এবং নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-ও ভারতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এখন পর্যন্ত পরিস্থিতিকে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত বলে উল্লেখ করেছে।
সরকারের উদ্যোগ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা
নিপা ভাইরাস মোকাবিলায় ভারত সরকার ও রাজ্য সরকারগুলি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
*সন্দেহভাজন রোগীর দ্রুত পরীক্ষা ও আলাদা রাখা ।
*আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সকলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ
*হাসপাতালগুলিতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ নীতি (Infection Control) জোরদার করা।
*সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি
বিশেষ করে বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, খোলা বা আধখাওয়া ফল না খাওয়ার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে। ফল ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়াই যুক্তিযুক্ত।
সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা
নিপা ভাইরাসের মতো মারাত্মক রোগ মোকাবিলায় কেবল সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষের সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি। গুজব বা আতঙ্ক ছড়ানো এড়িয়ে গিয়ে সঠিক তথ্য অনুসরণ করা, অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এই রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
উপসংহারঃ
ভারতবর্ষে নিপা ভাইরাস সংক্রমণ এখনও সীমিত পর্যায়ে থাকলেও এর উচ্চ মৃত্যুহার ও মারাত্মক প্রকৃতি একে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তোলে। সময়মতো সতর্কতা, শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। নিপা ভাইরাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং স্বাস্থ্য সচেতন জীবনযাপন ভবিষ্যতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ সংক্রমণঃ
২ জন নিশ্চিত নিপা ভাইরাস আক্রান্ত পাওয়া গেছে, যারা একজন নারী ও একজন পুরুষ নার্স এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণার(বারাসাত) থেকে।
তাঁরা ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষদিকে অসুস্থ হয়ে জানুয়ারির শুরুতে হাসপাতালে ভর্তি হন।
প্রথম রোগী সিস্টার নার্স এখনও চিকিৎসাধীন; দ্বিতীয় রোগী ব্রাদার নার্স হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। দু’জনের টেস্টও পরবর্তীকালে নেতিবাচক এসেছে।