মুখ্যমন্ত্রীর বন্যাতত্ত্ব উড়িয়ে পর্যটনে বিভোর ডিভিসি

মুখ্যমন্ত্রীর বন্যাতত্ত্ব উড়িয়ে পর্যটনে বিভোর ডিভিসি
সুবীর পাল; 'যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে।'
চিরায়ত এই বাংলা প্রবাদটি কখনও কখনও কতই না প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমাদের জীবনে। পারিপার্শ্বিক সমাজে। প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনাতে। তেমনই ভারসাম্যের ডিভিসির অঙ্গে কলেবরে।
বিদ্যুতের ত্র্যহস্পর্শ তাই চলছে চলুক না। উৎপাদনের প্রতিবদ্ধতায়। কে বারণ করেছে? আর বারণ করলে শুনছেটা কে শুনি। 'তা বলে কি প্রেম দেবে না যদি মারি কলসির কানা নেশা'র ঝোঁকের মতো নব পর্যটন মাদক সেবনে আপত্তি কোথায়?
সেকি? 'বিদ্যুতের ত্র্যহস্পর্শ', 'পর্যটন মাদক সেবন' কিম্বা 'যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে' এসব নানান ভিন্ন পুঁতির একখানি মালা গাঁথার তবে কারণটা কি?
দাঁড়াও পথিকবর। তিষ্ঠ ক্ষণকাল। তাহলে রেডি স্টেডি। এবার হোক তবে একটা বিগ ব্রেকিং অ্যানাউন্সমেন্ট। তাহলে শুনুন মহাশয় মহাশয়া, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন অর্থাৎ ডিভিসি এবার থেকে পর্যটন শিল্পেও পুঁজি নিবেশ করতে চলছে। এবং তা খুব শীঘ্রই।
সারা ভারতবর্ষ এতদিন শুনে এসেছে, দামোদর নদের বুকে বৃহৎ বৃহৎ জলাধার নির্মাণ করেছে ডিভিসি। এখানেই থেমে থাকেনি ডিভিসির পদযাত্রা। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এই সংস্থাটি জলবিদ্যুৎ এবং তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশের পূর্বাঞ্চলে এক অন্যতম পথিকৃৎ।
১৯৪৮ সালের ৭ জুলাই ভারতীয় গণপরিষদের একটি আইন বলে (ধারা নং XIV ১৯৪৮) ডিভিসি গঠিত হয়েছিল। আমেরিকার টেনেসি ভ্যালি অথরিটির আদলে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন গড়ে ওঠে। দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় ও বিহারের সেই সময়কার মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিনহার ত্রয়ী উদ্যোগে এই প্রকল্প গড়ে উঠেছিল।
প্রথম দিকে ডিভিসির মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বনসৃজন এবং ডিভিসি প্রকল্পের পরিচালনাধীন এলাকার বসবাসকারী মানুষদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি। বিগত কয়েক দশক যাবৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিভিসি অত্যধিক মনোনিবেশ করলেও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ ব্যবস্থায় এই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা সমগ্র দেশ এক কথায় মেনে নিয়েছে।
ডিডিসির নির্মিত তিলাইয়া, মাইথন ও পাঞ্চেতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। যার মধ্যে মাইথন ভারতের প্রথম ভূগর্ভস্থ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে চির পরিচিত। এছাড়া বোকারো, চন্দ্রপুরা, দুর্গাপুর ও মেজিয়ায় এই সংস্থার নিজস্ব তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। অন্যদিকে, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন দামোদর নদের উপর তিলাইয়া, মাইথন, পাঞ্চেত, কোনার ও দুর্গাপুরে অত্যাধুনিক এবং বৃহদাকার ব্যারেজও নির্মিত করেছে।
এ হেন ডিভিসি এবার পর্যটন শিল্পেও হৈ হৈ করে নেমে পড়তে চলেছে। এমন ভাবনাটা কিন্তু মোটেই মনগড়া নয়। এই ট্যাগ লাইনের নির্যাস কিন্তু বেড়িয়ে এসেছে ডিভিসির চেয়ারম্যান এস সুরেশ কুমারের মুখ থেকে। গত ২১ নভেম্বর তিনি এমনটাই স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেন কলকাতার একটি বণিকসভা আয়োজিত আলোচনা চক্রে। প্রধান অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, 'দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন তো বিদ্যুৎ উৎপাদনের মসিহা। তবু প্রতিষ্ঠানের বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক ভাবনাকে আরও প্রসারিত করতে আমরা সম্প্রতি এবার পর্যটন শিল্পে মনোনিবেশ করেছি।' তাঁর মতে, মাইথন, পাঞ্চেত ও কোনারে ডিভিসি নিজের মতো করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলবে। ওই সব ব্যারেজ সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর মানুষ এমনিতেই ঘুরতে আসেন। আমরা তাঁদের কথা চিন্তা করেই ওই সব অঞ্চলে অত্যাধুনিক পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করবো বলে মনস্থির করেছি। উক্ত তিন এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রকৃতই দৃষ্টিনন্দন। তাই সেখানে পর্যটকদের নিরাপত্তা দানের পাশাপাশি আধুনিক রিসোর্ট নির্মাণ করা হবে। বিভিন্ন রাইডের ব্যবস্থাও থাকবে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য।' ডিভিসির চেয়ারম্যানের বক্তব্য, 'আমরা নীতিগতভাবে ইতিমধ্যেই এই প্রসঙ্গে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। একইসঙ্গে ওই সব দামোদর বাহিকা স্থানে সংস্থার প্রচুর জমিও রয়েছে। ফলে সেখানে পর্যটন শিল্পকে বাহবা দিলে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবেন তেমন আমাদের সংস্থাও আর্থিক দিক থেকে লাভবান হবে। বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মীর সুযোগ কে ছাড়তে চায়?'
আলোচনা চলাকালীন কথাপ্রসঙ্গে ডিভিসির তরফে এস সুরেশ কুমার কার্যত হুঁশিয়ারি দেন পশ্চিমবঙ্গ সহ ঝাড়খণ্ডের একাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের বিরুদ্ধে। তিনি একপ্রকার ক্ষোভ উগড়ে জানান, এই দুই রাজ্যে কিছু কিছু আমাদের গ্রাহক আছে। যারা বিদ্যুৎ গ্রহণ করবেন কিন্তু পরিষেবার মূল্য চোকাতে যথেষ্ট অনীহা প্রকাশ করে। আমরা বারবার তাগাদা দিলে তারা আদালতে দৌড়ায়। ডিভিসিও এই বিষয়ে আদালতে শেষ দেখে ছাড়বে।' তিনি ঝাড়খণ্ডের বোকারো স্টিল প্ল্যান্টের নাম সরাসরি উচ্চারণ করে বলেন, 'ওই কারখানা থেকে আমাদের পাওনা পাহাড় সমান। আমরা ধৈর্য ধরছি মানে এই নয় যে ডিভিসি দাতা কর্ণ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সেরকম গড়ালে আমরা বোকারো স্টিল প্ল্যান্টের সঙ্গে আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের সংযোগ ছিন্ন করে দিতে দ্বিধা বোধ করবো না। আর সেই দায় ওই কারখানাকেই নিতে হবে। গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় একই সমস্যা এই রাজ্য থেকেও আমরা ক্রমাগত পেয়ে চলেছি। কেউ যেন এটা না ভেবে থাকে যে আমরা চ্যারিটি করছি। আমাদের প্রচুর ব্যয় করতে হয় কাঁচামাল ক্রয়ে, শ্রমিক শ্রমে ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। সুতরাং বকেয়া দাও পরিষেবা নাও পশ্চিমবঙ্গেও লাগু করা হবে কঠোর ভাবে। সেখানে রাজ্য সরকারি সংস্থাকেও কোনও রেয়াত করা হবে না বলে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সতর্ক করে দেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়।
কথাপ্রসঙ্গে তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া সমালোচনা করে বসেন। তিনি মন্তব্য করেন, 'বর্ষার সময় অতি বর্ষণ হলেও ডিভিসি কখনই চায় না কাউকে প্লাবিত করতে ইচ্ছাকৃত ভাবে। যে সমস্ত এলাকায় দামোদরের জল পৌঁছায় না, অথচ সেখানেও প্লাবনের জন্য কেউ কেউ ডিভিসিকে দোষারোপ করেন ইচ্ছাকৃত ভাবে। এ সব যাঁদের কাজ তাঁরা করবেনই। ডিভিসি এ ব্যাপারে মাথা ঘামাতে যায় না অনর্থক। তাঁর ভাষ্য, প্রবল বর্ষণ হলে প্রাকৃতিক কারণে ডিভিসি বিভিন্ন ব্যারেজ থেকে জল ছাড়তে বাধ্য হয়। নির্দিষ্ট বিধির মধ্যে দিয়ে। ব্যারেজগুলো ভেঙ্গে যাবে আর আমরা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকবো কারও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামাল দিতে, এটা চলতে পারে না। প্রয়োজনে জল ছাড়ার আগে আমরা পশ্চিমবঙ্গের সংশ্লিষ্ট দফতরকে ফোনে, মেইলে ও হোয়াটসঅ্যাপে পর্যায়ে পর্যায়ে সমস্ত তথ্য জানিয়ে দিই বরাবর যাবতীয় আইন ও চুক্তি মেনে। এরপর কেউ তা অস্বীকার করলে সেটা তিনিই বলতে পারবেন কোনও ভাবনার মধ্যে দিয়ে এই অসত্য বলে চলেছেন। এইটুকু বলবো, আমরা আমাদের কাজটা নিয়ম মেনেই করে থাকি।