কালিয়াগঞ্জে বয়রা কালীর ভোগে বৈচিত্র্য

কালিয়াগঞ্জে বয়রা কালীর ভোগে বৈচিত্র্য

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর: ১৯৬২ সালে কালিয়াগঞ্জে তৈরি হয় দেবীর নতুন মন্দির যা আজ বয়রা কালীমন্দির নামে বিখ্যাত। টিনের চালার আর বাঁশের বেড়ার মন্দির থেকে আজ বিশালাকার মন্দির তৈরি হয়েছে। সে বহুকাল আগের কথা। কালিয়াগঞ্জের শ্রীমতী নদীর ধারে বয়রা গাছের নিচের বেদিতে ফুল বেলপাতা দেখতে পেয়েছিলেন স্থানীয় জেলেরা। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল ধূপ-ধুনোর গন্ধ। তখনই তাঁরা ঠাওর করতে পেরেছিলেন, কেউ বা কারা সেখানে কালীর আরাধনা করেছেন রাতভর। সে কথা গিয়ে গ্রামবাসীদের জানিয়েছিলেন জেলেরাই। এরপর গ্রামবাসীরা নিজেদের উদ্যোগে সেই বয়রা গাছের নিচের বেদিতে শুরু করেছিলেন কালীর পুজো। সেই থেকেই বয়রা কালীপুজোর শুরু। কালিয়াগঞ্জ মা বয়রা কালীপূজা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক বিদ্যুৎ বিকাশ ভদ্র বলেন, 'এই ঐতিহ্যবাহী পুজোকে ঘিরে কথিত আছে এই মায়ের মন্দির নির্মাণে কালিয়াগঞ্জ তৎকালীন থানার বড়বাবু নাজমুল হকের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাই মা বয়রা কালীর পূজাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলা হয়ে থাকে।' টিনের চালা আর বাঁশের বেড়ার মন্দির থেকে আজ বিশালাকার মন্দির তৈরি হয়েছে যাদের প্রচেষ্টায় তারা হলেন প্রয়াত মন্টু লাহিড়ী, প্রয়াত কনক সিকদার, তৎকালীন থানার বড়বাবু নাজমুল হক সহ কালিয়াগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের উদ্যোগে। এই বয়রা মায়ের মন্দিরে স্থানীয় পৌরসভার প্রয়াত প্রাক্তন পৌরপিতা অরুন দে সরকারের উদ্যোগে কালিয়াগঞ্জ বাসীর সহযোগিতায় পূর্বের মৃন্ময়ীর মূর্তির পরিবর্তে সাম্প্রতিক কালে বসেছে মায়ের অষ্টধাতুর মূর্তি। দীপাবলির রাতে দেবীর সারা অঙ্গ জুড়ে থাকে নানাবিধ সোনার অলঙ্কার। মায়ের গায়ের স্বর্ণালঙ্কার পাহারায় কালিয়াগঞ্জ থানার পুলিশ বাহিনী সদা সর্বদা মোতায়েন থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং ভক্তদের বিশ্বাস, এখানে মা বয়রা কালীমাতার কাছে মানত করলে তা ফলে যায়। ফলে মানত পূরণ করতেই হাজার হাজার ভক্ত এখানে আসেন প্রতিবছর। কালিয়াগঞ্জের রাজনন্দিনীর এই পুজোতে শোল, বোয়াল-সহ পাঁচ রকমের মাছ ও পাঁচ রকমের সব্জি দিয়ে মায়ের ভোগ রন্ধন করা হয়।কালিয়াগঞ্জ মা বয়রা কালী পূজা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক বিদ্যুৎ বিকাশ ভদ্র বলেন, 'কথিত আছে শ্রীমতী নদী দিয়ে নৌকা আর বজরা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এই শহরে বাণিজ্য করতে আসতেন বণিকেরা। বিশ্রাম নিতেন এই বয়রা গাছের তলায়। পাশাপাশি এখানেই বেদি তৈরি করে ডাকাতরা মায়ের পুজো দিয়ে দক্ষিণের জেলাগুলোতে যেত ডাকাতি করতে।' দীপাবলির রাতের বয়রা কালীবাড়ির পুজোকে ঘিরে কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট সহ সমগ্র উত্তরবঙ্গের মানুষের উন্মাদনা থাকে চোখে পড়ার মতোই। কয়েক লক্ষ পূন্যার্থীর সমাগম ঘটে দীপাবলির রাতে। পাঁঠাবলি কিছু দিন পূর্বেও দুই-তিন হাজার হলেও বর্তমানে বলি প্রথা বন্ধ। তবে দূর থেকে আজও মানুষ ছুটে আসেন এ হেন পুজোর টানে।