নকলে ছেয়েছে বাজার,বিখ্যাত ‘জয়নগরের মোয়া’ পাড়ি দেবে বিদেশে

নকলে ছেয়েছে বাজার,বিখ্যাত ‘জয়নগরের মোয়া’ পাড়ি দেবে বিদেশে

সুভাষ চন্দ্র দাশ, ক্যানিং; জয়নগরের বিখ্যাত মোয়া চেয়ে শীতের শুরুতেই ভিন দেশ থেকে একের পর এক ফোন।শীতের লোভনীয় খাবারর জয়নগরের মোয়া চেয়েই প্রতিনিয়ত সৌদি আরব,ইংল্যান্ড,জাপান,ইউরোপ,আমেরিকা,বাংলাদেশ সহ দেশের দিল্লী,মুম্বাই,মহারাষ্ট,কলকাতা থেকে ফোন আসছে।আর সেই কারণেই মোয়া তৈরীর ব্যস্ততা তুঙ্গে। এমনটাই জানালেন জয়নগরের বহড়ু’র শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভান্ডারের রঞ্জিত কুমার ঘোষ ও বাবলু ঘোষ।তাঁরা আরো বলেন একদা বাংলার মহরাজ তথা বিশ্ববন্তিত ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলী ও এই মোয়ার স্বাদ পেয়ে আপ্লুত।যা এক যুগান্তকারী ইতিহাস। মূলত শীতের শুরুতেই মোয়ার রসদ জোগান দেওয়ার প্রস্তুতি আগে থেকেই নিয়ে রেখেছেন। এলাকার ২০০০ খেজুর গাছ সংগ্রহ করে রেখেছেন। যেখান থেকে বিখ্যাত সুগন্ধী এবং সুস্বাদু নলেনগুড় উৎপাদন হবে। এছাড়াও রয়েছে সুগন্ধী কণকচূড় ধানের খই সহ অন্যান্য উপকরণের সংমিশ্রণ।

উল্লেখ্য উনিশ শতকের শেষলগ্ন। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বহড়ু গ্রামের যামিনী বুড়ো তাজ্জব ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর নিজের খেতেই চাষ হতো সুগন্ধীতে ভরপুর কনকচূড় ধান। সেই কনকচূড় ধানের খইয়ের সঙ্গে নলেন গুড় মিশিয়ে মোয়া তৈরি করেন।সেই মোয়া পরিবেশন করলেন একটি অনুষ্ঠানে। এমন সুস্বাদু তৈরী জিনিস কেউ আগে কোন দিনই খায়নি।চারিদিকে ধন্য ধন্য রব শুরু হলো।এমন অভিনব ভাবে জন্ম হয় মোয়া’র।যা আজ জয়নগরের মোয়া নামে পৃথিবীখ্যাত ইতিহাস বহন করে। তবে মোয়ার জন্ম জয়নগরে নয়,বহড়ুতেই। জয়নগর টাউন সংলগ্ন বহড়ু গ্রামে। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার নামখানা লাইনের জয়নগরের ঠিক আগের স্টেশন এই বহড়ু।

মোয়ার পূণ্য জন্মস্থান বহড়ু গ্রামের ইতিহাসও এক ঐতিহ্যবাহী। রায়মঙ্গল কাব্যে উল্লেখ মেলে ‘বড়ুক্ষেত্রে’র। এই বড়ুক্ষেত্রই বহড়ু। উনিশ শতকের শুরুতে এই গ্রামের জমিদারি পায় নন্দকুমার বসু। তিনি ঠিক করেছিলেন বহড়ুতেই মথুরা-বৃন্দাবন স্থাপন করবেন। সেই ইচ্ছে অনুযায়ী, বহড়ুতেই তৈরি হয় শ্যামসুন্দরের মন্দির।জানা যায় সেই মন্দিরের গায়ে দেওয়ালচিত্র এঁকেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী গঙ্গারাম ভাস্কর। বহড়ুতেই ছোটোবেলা কেটেছে বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত কুমার ওরফে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং শক্তি চট্টোপাধায়ের।এছাড়াও রত্নগর্ভা হিসাবে বিখ্যাত এই গ্রামই জন্ম দিয়েছিল বাঙালির অতিপ্রিয় কণকচূড় খইয়ের মোয়া’র।যামিনীবুড়োর তৈরি সেই মোয়ায় অবশ্য খই আর নলেন গুড় ছাড়া উপকরণ বলতে আর কিছুই ছিলো না। সেই মোয়াকে পূর্ণ রুপ দিলেন জয়নগরের দুই বন্ধু পূর্ণচন্দ্র ঘোষ ওরফে বুঁচকিবাবু আর নিত্যগোপাল সরকার। দুজনে মিলে ঠিক করলেন এই মোয়া তৈরি করে বিক্রি শুরু করবেন। এতদিন হাটুরে, চাষী,গৃহস্থের বাড়ির লোকজন ইচ্ছে হলেই খই আর গুড় দিয়ে মেখে খেয়ে ফেলতেন। এবারে শুরু হল সেই মোয়ারই বাণিজ্যিক উৎপাদন। মোয়াতে মিশল খাঁটি গাওয়া ঘি, ক্ষীর,কিসমিস,কাজুবাদাম,এলাচ সহ অন্যান্য উপকরণ। খই আর গুড়ের জুটিও আরো অন্তরঙ্গ হল। ‘শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ এ শুরু হলো মোয়ার ‘জয়নগর’ তকমার আড়ালে পথচলা। সালটা ১৯২৯, কালক্রমে জয়নগরের মোয়া এমনই বিখ্যাত হয়ে উঠল যে তার নামের ভারে ধামাচাপা পড়ে গেল জন্মদাত্রী বহড়ুর নাম। এই ৯৬ বছরে জয়নগর-মজিলপুরেই গজিয়ে উঠেছে প্রায় ৩০০ মোয়ার দোকান। তবে, জয়নগর স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বাইরে বাস রাস্তার পাশে ‘শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ আজও ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই দোকানের খ্যাতি বুঁচকিবাবুর দোকান হিসেবেই। কিন্তু,গুণগত মান,মোয়ার দামেরও হেরফের এবং স্বাদের খ্যাতিতে এই দোকানকেও এখন টেক্কা দিয়ে ওভার বাউন্ডারি হাঁকাচ্ছেন কমলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, পঞ্চানন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার কিংবা রামকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মোয়া।দেড়শো টাকা কেজি থেকে দাম পৌঁছতে পারে ৫০০-৬০০ টাকা কেজিতেও।এমনকি ৭০০ টাকাও হতে পারে। এক-এক কেজিতে কুড়িটি করে মোয়া। খাঁটি জয়নগরের মোয়ার ক্ষেত্রে কণকচূড় ধানের খই আর নলেনগুড়ের রসায়নটাই আসল হয়ে দাঁড়ায়। মরিশাল নামে খইয়ের ধানও চাষ হয়। স্বাদে, গন্ধে কনকচূড়ের থেকে ঢের পিছিয়ে এই ধান। অথচ, কলকাতা ও শহরতলির বাজারে ‘জয়নগরের মোয়া’ তকমার আড়ালে গজিয়ে উঠেছে এই মরিশাল খইয়েরই মোয়া। একইসঙ্গে, আসল নলেন গুড় পাওয়াও দুষ্কর হয়ে উঠেছে এখন। উৎকৃষ্ট মোয়ার জন্য প্রয়োজন খাঁটি নলেন গুড়। জিরেন কাঠের খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন শিউলিরা। রেখে দেন তিন দিন। তারপর, সেই রস উনুনে একমাত্র খড় জ্বালিয়ে তৈরি হয় নলেন গুড়। এই নলেন গুড় আর কনকচূড়ের গুণমানে খামতি হলে প্রয়োজন পড়ে কৃত্রিম রং, ফ্লেভারের। যাঁরা রসিক, তাঁদের জিভ দিব্যি ধরতে পারে সেই ‘নকল’ স্বাদ।  দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি-কাকদ্বীপ-নামখানা এলাকায় ১৫০ একরেরও বেশি জমিতে আজো চাষ হয় কনকচূড় ধান। জিরেন কাঠের খেজুর রস আবার দুর্লভ  হচ্ছে দিন-দিন।হেমন্ত কালের শেষলগ্ন হতেই মোয়া তৈরির মরসুম শুরু হয়ে যায় জয়নগর-মজিলপুর-বহড়ুর বিস্তীর্ণ এলাকায়। অসংখ্য পরিবারের সারা বছরের রোজগার এই মাত্র কয়েক মাসের মোয়া তৈরি ও বিক্রি থেকেই যা আয় হয় তার উপর নির্ভর করতে হয়।মোয়াতে নলেন গুড়, খইয়ের সঙ্গে মিশ্রণ হয় গাওয়া ঘি, এলাচ, পেস্তা, খোয়া ক্ষীর। ওপরে কিসমিস, কাজু। ঘি, পেস্তা, ক্ষীরের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে দামের হেরফের ঘটে। চাহিদা বাড়লেও দাম ঊর্দ্ধমুখী হয় মাঝেমাঝেই।জয়নগরের মোয়ার আধিপত্যে কীভাবে যেন বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছে মোয়ার আবিষ্কর্তা যামিনী বুড়োর গ্রাম বহড়ু। যদিও, বহড়ুর মোয়ার স্বাদ কিন্তু মোটেও পিছিয়ে নেই জয়নগরের মোয়ার থেকে। বহড়ু বাজারের ওপরেই ‘শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের’ মোয়া বিখ্যাত। প্রায় একই উপাদান, কিন্তু জয়নগরের মোয়ার থেকে বহড়ুর মোয়া নরম। জয়নগরের মোয়ায় ক্ষীরের আধিক্য সামান্য বেশি, আর বহড়ুর মোয়ায় গুড়ের। স্বাদের বিচারে কে সেরা— তা নিয়ে অবশ্য রসিকদের মধ্যে বিবাদের শেষ নেই।স্বাদে পিছিয়ে না থাকলেও খ্যাতিতে বহড়ুর মোয়া ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারেনি জয়নগর। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, বহড়ুও বৃহত্তর জয়নগরেরই অংশ। সেই যুক্তিতে বহড়ুর মোয়াও জয়নগরের মোয়া। বহড়ুর মোয়া-বিক্রেতা-নির্মাতারা এই কথা মোটেও মানতে চান না। খ্যাতিতে পিছিয়ে থাকলেও আলাদা অস্তিত্বের এই গৌরব তাঁরা ছাড়তে রাজি নন।জয়নগর-বহড়ুর খাঁটি মোয়ার স্বাদে সিংহভাগ বাঙালিই কিন্তু বঞ্চিত। অথচ, বাজার ভরে আছে নকল ‘জয়নগরের মোয়ায়’।বাক্স খুললেই হলুদ পাতলা পলিথিনের ভিতর থেকে যে মোয়া উঁকি মারে, তাদের জন্মস্থল জয়নগর কিংবা বহড়ুর ধারেকাছেও নয়। উপকরণ, স্বাদ— খামতি সবদিকেই। উপায় নেই, তাই জেনে-বুঝেই কনকচূড়, আসল নলেন গুড়, ক্ষীর, পেস্তা, এলাচের সেই মধুমণ্ডের বদলে ‘জয়নগরের মোয়া’র তকমা সাঁটা মরীচিকার দিকেই ছুটে চলেছে মোয়া প্রেমী সাধারণ মানুষ। বাজারে আরো জাঁকিয়ে বসে ছদ্মবেশী ‘জয়নগরের মোয়া’র দোকান। এই নকল মোয়াদের ভিড় থেকে আসল মোয়া খুঁজে বের করা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার।খাঁটি মোয়া চাখার উপায় আপাতত একটাই। একবার সময় বের করে, গা ছাড়া দিয়ে জয়নগরগামী কোনো ট্রেনে উঠে পড়া। এরপর, বহড়ু কিংবা জয়নগর-মজিলপুর— নেমে পড়া। তারপর মোয়ার জন্মস্থানে একটু চেখে নেওয়া। তারপর সেই স্বাদ হবে ইতিহাস।