সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঐতিহ্যের ধারক নামখানার কাঁকড়াবুড়ি মেলা
অরিজিৎ মন্ডল, নামখানা:- দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের উপকূলবর্তী ব্লক নামখানা শুধু গঙ্গাসাগর যাত্রাপথের জন্যই পরিচিত নয়, বরং এই অঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেইসব ঐতিহ্যের মধ্যেই অন্যতম হল কাঁকড়াবুড়ি মেলা। প্রতিবছর এই মেলাকে কেন্দ্র করে নামখানা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও হাজার হাজার মানুষ এখানে ভিড় জমান। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই কাঁকড়াবুড়ি মেলা।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ছয় দশকেরও বেশি আগে এই মেলার সূচনা হয়। জানা যায়, ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে (প্রায় ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে) নামখানা ব্লকের শিবনগর আবাদ এলাকায় প্রথম এই পুজো শুরু হয়। সে সময় এলাকায় বসন্তসহ বিভিন্ন মহামারির প্রকোপ দেখা দেয়। আতঙ্কে গ্রামবাসীরা দেবী শীতলার আরাধনা শুরু করেন। স্থানীয় ভাষায় শীতলা দেবীকেই “কাঁকড়াবুড়ি” নামে ডাকা হয়।
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, দেবীর কৃপায় ওই মহামারির প্রকোপ কমে যায় এবং মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। সেই ঘটনার পর থেকেই প্রতি বছর নিয়ম করে দেবীর পুজো এবং মেলার আয়োজন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পুজো ও মেলা সুন্দরবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকউৎসবে পরিণত হয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার
কাঁকড়াবুড়ি দেবীকে সুন্দরবনের মানুষ অত্যন্ত জাগ্রত দেবী হিসেবে মনে করেন। গ্রামবাংলায় শীতলা দেবীকে সাধারণত মহামারি ও সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষাকারী দেবী হিসেবে পূজা করা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই এই অঞ্চলেও দেবীর আরাধনা চলে। কথিত রয়েছে পুজোর সময় নাকি নদী থেকে আপন নিয়মেই উঠে আসে কাঁকড়া আর সেই থেকেই গ্রামের মানুষেরা এই শীতলা দেবীকে কাঁকড়া বুড়ি নামে পূজা করে থাকে।
পুজোর দিন ভক্তরা বিভিন্ন মানত নিয়ে দেবীর কাছে আসেন। অনেকেই পরিবার-পরিজনের মঙ্গল কামনায় পুজো দেন। এই পুজোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল কাঁকড়াভোগ। দেবীর উদ্দেশ্যে কাঁকড়া সহ নানা ধরনের ভোগ নিবেদন করা হয় এবং পরে তা ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এবছরও গত বুধবার থেকে শুরু হয়েছে এই মেলা মেলার শুভ সূচনা করেন সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা, উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলার সহ সভাপতি শ্রীমন্ত কুমার মালি সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আগামী এক সপ্তাহ ধরে চলবে এই মেলা। প্রায় কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বর্তমানে মেলার দোকান বসে যেখানে দূরদূরান্ত থেকে আসা সুন্দরবনের মানুষেরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসে।
দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত, দর্শনার্থী এবং ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন।
মেলায় বসে নানা ধরনের দোকান—
মাটির ও বাঁশের তৈরি হস্তশিল্প
খেলনা ও গৃহস্থালির সামগ্রী
বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় খাবারের স্টল
নাগরদোলা ও শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর এই মেলায় কয়েকশো দোকান বসে এবং হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। ফলে মেলাটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় এই ধরনের মেলা শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি গ্রামীণ সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মিলনমেলার ক্ষেত্র। বছরের এই সময়টিতে দূরদূরান্তের মানুষ একত্রিত হন।
এছাড়াও এই মেলাকে ঘিরে স্থানীয় লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং ঐতিহ্যের একটি সুন্দর ছবি ফুটে ওঠে। স্থানীয় শিল্পী ও ব্যবসায়ীরাও এই মেলার মাধ্যমে নিজেদের পণ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার সুযোগ পান।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নামখানার কাঁকড়াবুড়ি মেলার জনপ্রিয়তা অনেকটাই বেড়েছে। বর্তমানে শুধু নামখানা বা আশপাশের গ্রাম নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ এই মেলায় অংশ নিতে আসেন। ফলে এটি সুন্দরবনের অন্যতম পরিচিত লোকউৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
লোকঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন হল নামখানার কাঁকড়াবুড়ি মেলা। কয়েক দশকের পুরোনো এই উৎসব আজও সুন্দরবনের মানুষের কাছে আস্থা, আনন্দ এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে রয়েছে। প্রতিবছর এই মেলাকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, তা এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে।
admin