সুন্দরবনের মধু কেন এত জনপ্রিয়?

সুন্দরবনের মধু কেন এত জনপ্রিয়?

প্রশান্ত সরকার, ঝড়খালী: সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলের বুক চিরে নদী, খাঁড়ি আর ম্যানগ্রোভ গাছের সারি যতদূর চোখ যায়—সেখানেই জন্ম নেয় এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ, সুন্দরবনের মধু। এই মধু শুধু খাদ্য নয়, এটি সুন্দরবনের মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে এক জীবন্ত প্রতীক। বিশেষ করে ঝড়খালী, গোসাবা ও কুলতলি এলাকার শত শত মৌয়ালের ঘাম, সাহস ও ঐতিহ্যের ফসল এই মধু আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।সুন্দরবনের মধু মূলত গেওয়া, খলসি, সুন্দরী, পশুর ও বাইন গাছের ফুল থেকে সংগৃহীত হয়। এই ম্যানগ্রোভ গাছগুলো জোয়ার-ভাটার জলে বেড়ে ওঠে, ফলে তাদের ফুলে লবণাক্ততার এক বিশেষ গন্ধ ও স্বাদ থাকে। সেই থেকেই সুন্দরবনের মধু হয় ঘন, গাঢ় বাদামি এবং এক অনন্য নোনাধারার মিষ্টি ঘ্রাণে ভরপুর। এতে কোনো রাসায়নিক সার, কীটনাশক বা কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করা হয় না, তাই এই মধু প্রকৃত অর্থেই “জৈব ও খাঁটি”। এই মধু সংগ্রহের মূল নায়করা হলেন সুন্দরবনের মৌয়ালরা—বিশেষ করে ঝড়খালী, গোসাবা ও কুলতলি অঞ্চলের মানুষরা। তারা প্রতি বছর মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত জঙ্গলে প্রবেশ করেন “ফরেস্ট পারমিট” নিয়ে। নদী পেরিয়ে, কুমিরভরা খাঁড়ি অতিক্রম করে, বাঘের মুখোমুখি হওয়ার ভয় নিয়েও তারা মধু সংগ্রহ করেন। অনেক মৌয়াল ঘরে ফেরেন না—বাঘ, কুমির বা নৌকা ডুবে নদী কেড়ে নেয় তাঁদের জীবন। তবুও এই বিপদসঙ্কুল পথ পেরিয়ে তাঁরা প্রকৃতির এই সোনার তরল নিয়ে আসেন মানুষের ঘরে ঘরে। ঝড়খালীর মৌয়াল হরিপদ মাঝি বলেন, “বাঘের ভয় থাকে, কিন্তু মধুর টানও কম নয়। এটাই আমাদের রোজগার, আমাদের গর্ব।” গোসাবা ও কুলতলির মতো এলাকায় একসময় প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই অন্তত একজন মৌয়াল বনাঞ্চলে যেতেন। আজও বহু পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। অনেক মহিলা মৌয়ালদের সাহায্য করেন মধু ছাঁকা, শুকনো করা ও বোতলজাত করার কাজে। ফলে এই মধু শুধু পুরুষের নয়, সুন্দরবনের নারীশক্তির পরিশ্রমেও গড়া।সুন্দরবনের মধু পুষ্টিগুণে ভরপুর—এতে রয়েছে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খনিজ ও এনজাইম, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, গলা ব্যথা ও কাশিতে উপকারী এবং হজমে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভ ফুলের মধু সাধারণ ফুলের মধুর তুলনায় বেশি অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণসম্পন্ন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তর, কো-অপারেটিভ সংস্থাগুলি মৌয়ালদের নিরাপদ ও পরিবেশ-বান্ধব মধু সংগ্রহে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন মৌয়ালদের জীবনের ঝুঁকি কমছে, অন্যদিকে সুন্দরবনের বনজ সম্পদও রক্ষা পাচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে এই মধু বোতলজাত করে বাজারজাত করা হচ্ছে, যা ইতিমধ্যেই সারা দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে এখনও অনেক জায়গায় ভেজাল মধুর ব্যবসা চলছে, যা খাঁটি সুন্দরবন মধুর মান নষ্ট করছে। তাই ক্রেতাদের সচেতন হওয়া জরুরি—সরকারি বা স্থানীয় স্বীকৃত সংস্থার বোতলজাত মধুই কেনা উচিত। সুন্দরবনের এই মধু কেবল প্রকৃতির দান নয়—এটি সেই সব সাহসী মৌয়ালদের ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের প্রতীক, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের হাতে তুলে দেন প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। সত্যিই, এই মধু শুধু মিষ্টি নয়—এতে মিশে আছে সুন্দরবনের হৃদয়ের স্পন্দন।