নাজমিন মর্তুজা, কবি ও গবেষক, প্রবাসী বাংলাদেশী, অস্ট্রেলিয়া: যে রাষ্ট্র এক মৃত্যুকে শোক বানায় আর আরেক মৃত্যুকে নীরবতায় কবর দেয়, সে রাষ্ট্র আসলে মানুষের নয় সংখ্যার পক্ষে দাঁড়ানো এক নিষ্ঠুর যন্ত্র মাত্র।একই দিনে দেশের ভেতরে ঘটেছে দু’টি মৃত্যু। দু’টি জীবন থেমে গেছে। কিন্তু তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাগ্য এক নয়। এক মৃত্যু সংখ্যাগুরুর,রাষ্ট্র শোক ঘোষণা করে, মিডিয়া ব্যস্ত হয়, শব্দ ওঠে, আলো জ্বলে। আরেক মৃত্যু সংখ্যালঘুর, সংবাদপত্রের পাতায়ও যার ঠাঁই নেই, জনপরিসরে যার কোনো প্রতিধ্বনি নেই। ময়মনসিংহের ভালুকায়, ডুবালিয়াপাড়ায়, পাইওনিয়ার নিট কম্পোজিট কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাশকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে, জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। মহাসড়কের মাঝখানে। প্রকাশ্যে। জনতার সামনে। অথচ এই মৃত্যু যেন রাষ্ট্রের হিসাবেই পড়ে না। কারণ এটা “সাধারণ” মৃত্যু। এখানে ক্ষমতার গ্লামার নেই, সংখ্যার জোর নেই, রাজনৈতিক বিনিয়োগ নেই।এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।দুটো হত্যার বিচার চাই, এটা আমার সুস্থ মস্তিষ্কে দাবী !একটা দেশে যখন হত্যার মূল্য নির্ধারিত হয় নিহতের পরিচয়ে সে সংখ্যাগুরু না সংখ্যালঘু তখন সেই দেশ আর আইনের দ্বারা নয়, বরং জনতার আবেগ আর ধর্মীয় উন্মত্ততার দ্বারা শাসিত হতে শুরু করে। তখন অপরাধ আর অপরাধ থাকে না; হয়ে যায় “প্রতিক্রিয়া”। খুন আর খুন থাকে না; হয়ে যায় “ধর্মরক্ষা”।এখানেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে রসাতলে নামে। কারণ বিচারহীনতা শুধু আদালতের ব্যর্থতা নয়, সমাজের সম্মতিও বটে। যখন মিডিয়া চুপ থাকে, রাজনীতি নিশ্চুপ থাকে, তথাকথিত সচেতন মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন সেই নীরবতাই পরবর্তী হত্যার লাইসেন্স হয়ে ওঠে। আজ বিচার দাবি করলেও হয়তো কোনো যন্ত্র নড়বে না। কিন্তু ইতিহাসের একটা নির্মম নিয়ম আছে যে সমাজ অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে সে সমাজ একদিন নিজেই সেই অন্যায়ের শিকার হয়। প্রকৃতি হিসাব রাখে। সময় সুদে আসলে আদায় করে।এই লেখা কোনো শোকবার্তা নয়। এটা সতর্ক সংকেত।কারণ আজ যে মৃত্যু নিস্তব্ধ, কাল সেই নীরবতাই পুরো দেশটাকে গ্রাস করতে পারে। রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, তখনই সভ্যতা সবচেয়ে জোরে ভেঙে পড়ে।ইউনুস সাহেব কড়ে আঙুল ছুঁইয়ে ভাগ্য গণনা করতেন আর দেশের ভাগ্যকে ঠেলে দিলেন অনিশ্চয়তার খাদে।যাঁরা তাঁর সুখের সময় পাশে ছিলেন, ভাগাভাগি করে খেয়েছেন, গোপন বৈঠকে দেশ নিয়ে “প্ল্যানচেট” খেলেছেন তাঁরাই আজ নীতির জ্ঞান দিচ্ছেন।আমাদের বড় দুর্বলতা একটাই সমষ্টিগত স্মৃতি ভয়ংকর ছোট।দেশের মানুষ ভুলে যায়, প্রশ্ন করে না। তাই ইউনুস সাহেবও দেশের মানুষকে মৃত্যুর ঝুঁকি ছাড়া আর কোন কিছু দিতে পারেননি।অতিরিক্ত সবকিছুই ক্ষতিকর দেশপ্রেমও তার ব্যতিক্রম নয়।কারণ এই দেশে দেশপ্রেম মানে দাঁড়িয়েছে এমন এক ধারণা, যেখানে নেতা নিরাপদ থাকে, আর জনগণ মরতে শিখে।একটা মৃত্যু একটা পরিবারের জন্য অসহনীয় বোঝা। কিন্তু এই রাজনীতিতে মৃত্যু কেবল সংখ্যা। দেশপ্রেম যদি কারও একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে যায়,তাহলে সেই দেশপ্রেম আর গৌরব নয় তা ভয়ের অস্ত্র। এটা আন্দোলন নয় এটা মগের মুল্লুক বানানোর বৃথা চেষ্টা।দেশ বাঁচে না, সম্পদ বাঁচে।আর সেই হিসাবেই আজ তথাকথিত দেশপ্রেমের মানে লেখা হয়। একজন নিরীহ সংখ্যালঘু শ্রমিককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, পুড়িয়ে হত্যা করা হলো আর সমাজ, রাষ্ট্র, তথাকথিত মানবতাবাদীরা নীরব রইল। আইন ভাঙাকে বিপ্লব বলা মানেই গণহত্যাকে নৈতিকতা শেখানো।রাষ্ট্র যখন চুপ থাকে, তখন বিশৃঙ্খলাই শাসন করে সংখ্যাগুরুর একজন সহিংস চরিত্রের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক, অথচ সংখ্যালঘুর নির্মম হত্যায় কোনো বিবেকই প্রতিক্রিয়া নেই।মানবতাবাদ আজ নির্বাচনী ও পরিচয় ভিত্তিক, ন্যায় নয়, পক্ষই মুখ্য। বিশৃঙ্খলা কোনো প্রতিবাদ না এটা রাষ্ট্রের বুক চিরে খাওয়া মবের লালসা। আইনশৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে দেখেছে, মিডিয়া এড়িয়ে গেছে, বুদ্ধিজীবীরা ব্যাখ্যায় ঢেকেছে। এই দ্বৈত নীরবতাই প্রমাণ করে দেশটা মানবতা হারিয়ে মবের শাসনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। আইন ভাঙাকে বিপ্লব বলা মানেই গণহত্যাকে নৈতিকতা শেখানো। বিশৃঙ্খলা রাষ্ট্রের জন্য ধ্বংস এটা কোনো বিপ্লব না, এটা খাঁটি অরাজকতা।আইন ভাঙলে দেশ বাঁচে না, শুধু মব আর ক্ষমতয় মোটা হয়। দেশ ভাঙছে শত্রুতে না, ভাঙছে নিজেদের পুষে রাখা মব দানবে। সারাদেশ জ্বলছে,আর ক্ষমতা বলছে, সব ঠিক আছে। এটা আন্দোলন না, এটা পুরো দেশটাকে আগুনে ঠেলার খেলাধুলা। রাস্তায় আগুন, মাথায় অন্ধত্ব এই হলো রাষ্ট্রীয় ইউনুস নীতি। দেশ জ্বালিয়ে যারা ক্ষমতা মাপে, তারা খাঁটি অগ্নিসন্ত্রাসী। আগুন নেভানোর দায়িত্ব যাদের, তারাই দেশটাকে পুড়িয়ে খাচ্ছে। এখানে আগুন লাগে মানুষে, নিরাপদ থাকে থাকে শুধু সম্পদ। সারাদেশ বারুদের স্তূপ, আর শাসকেরা করছে নৈতিক ভাষণ। আগুন যখন নীতিতে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র থাকে শুধু নামকাওয়াস্তে।জ্বলন্ত দেশকে শান্ত বলা মানে এক প্রহসন এবং মিথ্যা।