অর্থের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে অপূর্ব’র বাঁশির সুর
সুভাষ চন্দ্র দাশ,ক্যানিং - তার বাঁশির সুরে ভোরের ঘুম ভাঙে গ্রামের মানুষের।ভোর আকাশের শিশির বিন্দুর সাথে ধরণী’র কোলে ঝরে পড়ে শিউলি। আবার গ্রামের গৃহবধুরা তার বাঁশির সুরে মূর্ছনা হয়ে সন্ধ্যাবেলায় তুলসি তলায় প্রদীপ জ্বালেন।বছর তেইশ বয়সের যুবক। নাম অপূর্ব মন্ডল।একদম ছোট বেলায় বাঁশির সুর শুনে শেখার ইচ্ছা হয়েছিল তার। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ক্যানিং থানার অন্তর্গত গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা।৪ ভাই আর ১ বোন। পরিবারে সকলের ছোট অপূর্ব।খুব ছোট অবস্থায় সকল কে ফেলে রেখে অন্যত্র চলে যায় অপূর্ব’র বাবা। সেই থেকে মা উর্মিলা মন্ডল কলকাতায় পরিচারিকার কাজ করে ছেলেমেয়েদের কে মানুষ করে চলেছেন।একমাত্র মেয়ে কে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন উর্মিলা দেবী।চার ভাইয়ের পড়াশোনার খবচ যোগান দিতে পারছিলেন না। ফলে এক সময় সকলেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে কাজের খোঁজ করতে থাকে।পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে অপূর্ব একটু অন্য রকম।একদম ছোট থেকেই বাঁশি বাজানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে সে।পরে পাড়ার একটি মেলা থেকে বাঁশি কিনে বাজাতে থাকে।একসময় তার বাঁশির কর্কশ আওয়াজে এলাকার প্রতিবেশিরা অতিষ্ট হয়ে উঠতেন। এমনকি প্রতিবেশি লোকজন অপূর্ব’র বাড়িতে চড়াও হয়ে বাঁশি বাজানো বন্ধের নির্দেশ দেয়।কিন্তু কে শোনে কার কথা! অপূর্ব হতে চায় পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া’র মতো একজন বাঁশিবাদক। বাঁশিই তার একমাত্র ধ্যান জ্ঞান ও জীবন।বাঁশি বাজিয়ে বড় হতে চায়। বাঁশি বাজিয়ে দেশকে বিশ্বমাঝে তুলে ধরতে চায়।তাকে কে আটকে রাখতে পারে?একদা প্রতিবেশিদের চাপে পড়ে বাঁশি নিয়ে বেরিয়ে পড়তো প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠের দিকে। কখনো সকালে কখনও বা দুপুরে কিংবা গোধূলি বেলায় এই ভাবেই বাজিয়ে চলতো বাঁশি।এইভাবেই চলতে থাকে তার বাঁশির কান্না।স্কুলে পড়া না পারলে তার বাঁশির সুর তাকে বাঁচিয়ে দিতো।শিক্ষক শিক্ষিকারা তার বাঁশির সুরে মজে যেতেন। এমন কি বিদ্যালয়ে কোন অনুষ্ঠান হলে বাঁশি বাজানোর জন্য ডাক পড়তো অপূর্ব’র। অভাব অনটনের মধ্যে চেষ্টা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যায় উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি টপকাতে না পেরে থামতে হয় অপূর্বকে।ছোট থেকে একমাত্র দুবার বাঁশি কিনে বাজিয়েছে। তারপর থেকেই নিজেই বাঁশি তৈরী করে একটু আয়ের পথ শুরু করে। সেটাও যৎসামান্য। সারা বছরে মাত্র ১২-১৪ টা বাঁশি তৈরীর অর্ডার মেলে।এখন অপূর্ব’র বাঁশির সুর শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন প্রতিবেশী সহ অন্যান্যরা।ছোট থেকেই কোন তালিম ছাড়া রবীন্দ্র গীতি,নজরুল গীতি,শ্যামা সঙ্গীত সহ বিভিন্ন গানের সুর তার বাঁশিতে বেজে ওঠে।বড় হতে হতে গেলে তালিম প্রয়োজন,উন্নত মানের বাঁশিরও প্রয়োজন?ইচ্ছা থাকলেও হয় না। কারণ অর্থনৈতিক পরিকাঠামো নেই।এছাড়াও যাদের নুন আনতে পান্ত ফুরায়!তবে অপূর্ব’র পরিচারিকা মা উর্মিলা দেবী চায় তাঁর সন্তান বাঁশি বাজিয়ে একদিন অবশ্যই দেশের মুখ উজ্জল করবে।কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি জানান ‘ছোট থেকেই ওর পাশে কেউ নেই। প্রথমে বাঁশি বাজালে পাড়ার লোকজন অশান্তি করতো। এখন অবশ্য তাঁরাই প্রতিদিন বাড়িতে এসে অপূর্বর কাছে আবদার করে বাঁশি বাজানোর জন্য।অর্থ কষ্ঠের জন্য কোথাও কোন তালিম নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি।দারিদ্রতাই সমস্ত কিছুই কেড়ে নিয়েছে। যদি কোন সহৃদয় শিল্পীর সান্নিধ্য পায় কিংবা কেউ যদি আর্থিক ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে সরস্বতীর আশীর্বাদে আমার অপূর্ব’র অপূর্ব প্রতিভা আরো বেশি করে উন্মোচিত হতে পারে।না হলে হয়তো ওর বাঁশির সুর চিরতরে থমকে যাবে’। অন্যদিকে পাড়া পড়শিরাও চায় অপূর্ব’র পাশে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কোন শিল্পী বা সংস্থা দাঁড়ালে আরো প্রষ্ফুটিত হবে তার বাঁশির সুর। আর তা না হলে অচিরে ঝরা বকুলের মতো শুকিয়ে যাবে তার বাঁশির সুরেলা কন্ঠ।’
admin