অনুদান ও রাজনীতিতে বিপন্ন সরকারি শিক্ষা

অনুদান ও রাজনীতিতে বিপন্ন সরকারি শিক্ষা

আরিফুল ইসলাম: সময় বহমান। তৃণমূল কংগ্রেস তিন টার্ম মিলিয়ে রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় আছে প্রায় ১৫টা বছর। কিন্তু সরকারি বিদ্যালয়, সরকারি পোষিত বিদ্যালয়, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়, ক্রিশ্চান মিশনারি বিদ্যালয় যেটাই বলুন সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিকাঠামো ও উন্নয়নের কাঁটা যেন এক জায়গায় এসে থমকে আছে। বর্তমান এই তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসে ২০১১ সালের মে মাসে সেই সময় সরকারি একাধিক ধরনের বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক ফী বাবদ ধার্য করা ছিল মাত্র ২৪০ টাকা। শুনলে অবাক হবেন, আজ ২০২৬ সালেও সেই অঙ্কের কোনওরকম পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ মাসে মাত্র ২০ টাকা খরচে মাথা পিছু সস্তায় পড়াশুনার কথা শুনতে আমরা আত্মতৃপ্তি পেতেই পারি বটে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির রূঢ় বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। গত ১৫ বছরে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় দ্বিগুণ-তিনগুণ বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যালয়ের সংগৃহীত অর্থে ব্যাপক মরচে ধরেছে শুধু নয়। আজ এই অসামঞ্জস্য বাংলার সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।
সাধারণ হিসাবানুযায়ী যদি বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে 'সাধারণ মূল্যবৃদ্ধি ধরা হয়, তবে ২০১১ সালের ২৪০ টাকার বর্তমান ক্রয় ক্ষমতা হওয়া উচিত কমপক্ষে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ আজ যে শিক্ষার্থীকে মাসে ২০ টাকা দিতে হচ্ছে। অথচ বাস্তব পরিস্থিতিতে তা ন্যূনতম ৪০-৫০ টাকা হওয়া উচিত। অথচ আয়ের পথ সীমিত রেখে সরকার বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য বরাদ্দ 'কম্পোজিট গ্র্যান্ড'। সহজ কথায় বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সরকার আগে যেখানে ১০০ টাকা খরচ করতো, এখন সেই ১০০ টাকার অবমূল্যায়নে তা দাঁড়াচ্ছে ২০-২৫ টাকা। প্রাথমিক থেকে মহাবিদ্যালয় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত সর্বত্রই সরকারের এই আর্থিক অনীহা বা ঔদাসীন্য আজ জলের মতো পরিষ্কার।
রাজ্য সরকারের এক শ্রেণির শীর্ষ আধিকারিকদের যুক্তি হল, তারা শিক্ষাশ্রী, কন্যাশ্রী বা সবুজ সাথীর মতো জনমোহিনী প্রকল্পগুলিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। এছাড়াও পড়ুয়াদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠিয়ে সরকার রাজনৈতিক বাহবা কুড়োলেও, বিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানের মেরুদন্ডের সার্বিক স্বাস্থ্য সচেতনতার দিকে মোটেই লক্ষ্য নেই। অর্থাৎ বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে যে অর্থ স্বাভাবিক নিয়মে সরকারের যোগান দেওয়ার কথা, তাতে চূড়ান্ত অনীহা প্রকাশ পায়। ফলে গত ১৫ বছর আগের তুলনায় বর্তমানের আকাশ ছোঁয়া দামের কাগজ অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রীর ভার বইতে গিয়ে চূড়ান্ত নাজেহাল হচ্ছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
আগে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির প্রশ্নপত্র উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ নিজস্ব খরচে সরবরাহ করতো। এখন একাদশ শ্রেণির ফার্স্ট ও সেকেন্ড সেমিস্টারের প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে পরীক্ষা নেওয়ার যাবতীয় দায়দায়িত্ব বিদ্যালয়ের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ক্ষেত্রেও যাবতীয় খরচও বিদ্যালয়ের ঘাড়ে। এছাড়াও আজকের দিনে প্রতিটি স্কুলে স্টেশনারি বাবদ প্রচুর অর্থ খরচ করতেই হয়। উল্টে এই সকল সামগ্রীর ওপর রাজ্য সরকার যারপরনাই জিএসটি আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ও তৎপর। অথচ অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নিরাপত্তা কর্মী, সাফাই কর্মীর মতো জরুরিভিত্তিক খরচ সরকারি তালিকায় নেই। এছাড়াও আছে বাৎসরিক পরিকাঠামোগত খরচ এটাতেও সরকারি কোনও ফান্ড নেই। সুতরাং সব দায়ভার স্কুলগুলির ওপর নিজের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বেসরকারি বাংলা বা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলি কলমের এক খোঁচায় বেতন বৃদ্ধি করে নিতে পারে। সেখানে গ্রাম বাংলায় এই সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে বা সরকারি পোষিত বিদ্যালয়ে রাতারাতি বেতন বৃদ্ধি করার বাধ্যবাধকতা আছে। তাহলে এলাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
একদিকে অনুদান অন্য দিকে ভোট রাজনীতির প্যাঁচে পরে 'বাংলার স্কুলে'র আজ ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এর সঙ্গে চরম বিপন্ন সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা। সুতরাং সরকার যদি আন্তরিক ভাবে এই সিস্টেমের দ্রুত পরিবর্তন না করে, তাহলে শুধুমাত্র পরিকাঠামোর অভাবে বাংলার সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা একদিন শুকিয়ে মরতে বাধ্য।